লম্বা পায়ে মাঠজুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে এক ব্যক্তি। মাথায় রঙিন পরচুলা। সাজসজ্জাও অদ্ভুত। বিশেষ কায়দায় বাঁশের এক জোড়া লম্বা লাঠির সাহায্যে ‘রণপা’ তৈরি করে হাঁটছিল ওই ব্যক্তি, যা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের একটি অংশ। সেই রণপা সাজের ব্যক্তির কাছে শিশু-কিশোরদের অনেকে আগ্রহ নিয়ে যাচ্ছিল, কেউ আবার কাছে যেতে ভয় পাচ্ছিল। এর মধ্যেই পাশে দাঁড়িয়ে ছবি কিংবা সেলফি তোলা ও হাত মিলিয়ে করমর্দনও করছিল কেউ কেউ।
এ ছাড়া মাঠজুড়েই ছিল শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার নানা উপকরণ। মিনি ফুটবল খেলে গোল দেওয়া, লুডু খেলে পুরস্কার জেতা কিংবা বুদ্ধি খাটিয়ে ‘ফুট স্টেপ’ খেলা। এর বাইরে অনেক শিশু-কিশোর ছিল বাবুল্যান্ডে খেলাধুলায় কিংবা বায়োস্কোপ দেখায় মত্ত। অনেকে আবার টিয়া পাখির সাহায্যে নিজেদের ভবিষ্যৎও জেনে নিচ্ছিল।
রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় দক্ষিণ বারিধারা সোসাইটি মাঠে প্রথম আলো আনন্দমেলায় গতকাল শুক্রবার সারা দিনের চিত্র ছিল এমনই। সকাল থেকেই সেখানে ছিল উৎসবের আমেজ। মেলা শুরু হয় সকাল আটটায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে শিশু-কিশোর, অভিভাবকসহ এলাকাবাসীর আগমনে তা জমজমাট হয়ে ওঠে।
শুক্রবার সকাল আটটার কিছু আগে মাঠে গিয়ে দেখা যায়, অভিভাবক নিজ নিজ সন্তানদের নিয়ে মাঠে আসছেন। সবার হাতে হাতে আঁকাআঁকির রংপেনসিল, তুলি, খাতা, স্কেল ও অন্যান্য সরঞ্জাম। সাড়ে আটটায় শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘প্রথম আলো আনন্দমেলা’। প্রতিযোগিতায় তিন শতাধিক শিশু-কিশোর অংশ নেয়।
প্রতিযোগিতায় পাশাপাশি বসে আঁকে দুই ভাই মেহরাব তালহা ও মাহির তাহমিদ। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের বাবা মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে জানান, বড় ছেলের স্কুল মাঠের পাশেই। স্কুলে ছেলেকে আনা–নেওয়ার সময় দেখেন মাঠে এই অনুষ্ঠান আছে। পরে দুই ছেলেকে বলে রেখেছিলেন যে তাদের এখানে অংশগ্রহণ করাবেন। ছোট ছেলে মাহিরের চিত্রাঙ্কনে বেশি ঝোঁক বলেও জানান তিনি। পরে মেহরাব জুনিয়র ক্যাটাগরিতে দশম স্থান অর্জন করে। সে স্মৃতিসৌধ এঁকেছিল।
এরপরে দক্ষিণ বারিধারা সোসাইটি ও দক্ষিণ বারিধারা ইয়ুথ ক্লাবের অংশগ্রহণে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। শিশু-কিশোরেরা নাচ, গান, ছড়া ও কবিতা আবৃত্তি করে অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। ওই সময়ে মাঠের অন্য এক পাশে শুরু হয় শিশু-কিশোরদের বিস্কুট দৌড় ও মার্বেল দৌড় খেলা। এতে আগ্রহীদের সংখ্যা অনেক বেশি থাকায় আয়োজকদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে। প্রতিযোগিতার জন্য মাঠের নির্ধারিত অংশ কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল।
মার্বেল দৌড়ে মেয়েশিশুদের মধ্যে প্রথম পুরস্কার পায় কেজি শ্রেণির শিক্ষার্থী হৈমন্তী রায়। সে জানায়, ‘আমি মার্বেল খেলায় পুরস্কার পেয়েছি। অনেক ভালো লাগছে। এখানে এসে ম্যাজিক দেখেছি, মার্বেল খেলেছি, আইসক্রিম খেয়েছি। আমরা বন্ধুরা মিলে অনেক মজা করেছি।’
হৈমন্তীর বাবা কিশোর কুমার রায় বলেন, খুবই চমৎকার আয়োজন। বাচ্চাদের পাশাপাশি বড়দের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। মেয়ে অংশগ্রহণ করেছে, আমিও অংশগ্রহণ করব। অংশগ্রহণের মধ্যেই আনন্দ। মেয়ের পুরস্কার পাওয়াতে সেই আনন্দ আরও বেশি লাগছে। সরকারিভাবে নগরবাসীর জন্য আরও বেশি খোলামেলা জায়গা সংরক্ষণ করা দরকার বলেও জানান তিনি।
শিশু-কিশোরদের প্রতিযোগিতা শেষে মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জাদু প্রদর্শনী, পুতুলনাচ ও রোবট শো। শিশু-কিশোরেরা উৎসাহ আর আনন্দ নিয়ে এসব আয়োজন উপভোগ করে। এরপরে নামাজ ও দুপুরের খাবারের বিরতি ছিল। এ সময় তরুণ-তরুণীদের কেউ কেউ ভিড় জমান প্রথমার বইয়ের স্টলে।
প্রথম আলো আনন্দমেলার টাইটেল স্পনসর এসিআই পিওর। প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ব্র্যান্ড ম্যানেজার অনিক কুমার দেবনাথ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নাগরিক জীবন থেকে এসব আয়োজন আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছে। এই এলাকায় মানুষের যে অংশগ্রহণ, তা দেখে আমরা আনন্দিত। এই মেলা এলাকাবাসীর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। প্রথম আলোর এই উদ্যোগকে ধন্যবাদ জানাই।’
আয়োজনের অন্যতম স্পনসর ছিল কিশোয়ান গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির জিএম সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং এ এইচ এম আব্দুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা শহরে মানুষের বিনোদনের সুযোগ কমে যাচ্ছে। এলাকাভিত্তিক এমন আয়োজন স্থানীয় লোকজনের জন্য বড় বিনোদন হয়ে দাঁড়ায়। এতে পরিবারগুলো আনন্দ পায়। এই আয়োজন অব্যাহত থাকুক।
দুপুরের বিরতির পর হয় পুরুষ ও নারীদের (অভিভাবক) জন্য বালিশ ও ফুটবল পাসিং খেলা। দুটো খেলাতেই পুরো মাঠ ভরে যায়। আয়োজকদের হিসেবে পুরুষ অভিভাবকদের খেলায় সাড়ে তিন শর বেশি এবং নারী অভিভাবকদের খেলায় প্রায় সাড়ে চার শ অভিভাবক অংশগ্রহণ করেন। অভিভাবকেরা চেয়ারে বসে গান বাজার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল কিংবা বালিশ একজন আরেকজনের হাতে পাস দিয়ে দিচ্ছিলেন। পেছনে দাঁড়িয়ে হাতের তালিতে তখন বাবা-মায়েদের উৎসাহ দিচ্ছিল সন্তানেরা।
পুরুষদের ফুটবল পাসিং খেলায় প্রথম হয়ে ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা বিমানের দুটি টিকিট জেতেন মোহাম্মদ শাহ আলম। তিনি বলেন, সকাল থেকেই বাচ্চারা অনেক আনন্দ নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। তাদের পাশাপাশি বড়দের আয়োজনে অংশ নিতে পেরে শেষে পুরস্কার জিতে খুবই ভালো লাগছে। নিয়মিত এমন আয়োজন দরকার।
মেলা আয়োজনের ব্যবস্থাপনায় সহযোগী ছিল দক্ষিণ বারিধারা সোসাইটি ও দক্ষিণ বারিধারা ইয়ুথ ক্লাব। সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রাফি হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকা শহরে এমনিতেই মানুষের পরিবার নিয়ে সময় কাটানো, বাইরে যাওয়ার পরিবেশও খুবই কম। যাওয়ার কোনো জায়গাও সেই অর্থে নেই। তাই এমন একটা আয়োজনে এলাকাবাসী সবাই অনেক আনন্দ নিয়ে অংশগ্রহণ করছে। আমরা সোসাইটির পক্ষ থেকে এমন আয়োজনকে স্বাগত জানাই।’
বিকেলে মেলায় উপস্থিত হন প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। তিনি মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখেন। মেলায় আশা শিশু-কিশোর ও অভিভাবকদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। শেষে তিনি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশু-কিশোরদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন।
আনিসুল হক বলেন, ‘এখানে এসে একটা অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখছি। এটা সত্যিকারের একটা মেলার রূপ নিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন গ্রামের মেলার মধ্যে পৌঁছেছি। সবাই খুব আনন্দ নিয়ে অংশগ্রহণ করছে। কারণ, মানুষ যাওয়ার জায়গা খোঁজে, বিনোদনের জায়গা খোঁজে।’
আনিসুল হক আরও বলেন, ‘প্রথম আলোর লক্ষ্য সুন্দর বাংলাদেশ গড়া। আমাদের একটাই লক্ষ্য, বাংলাদেশের জয়। আমরা যদি বই পড়া, সত্য তথ্য অনুসন্ধান করা, বিজ্ঞান চিন্তা করা—এসবের মধ্যে আসি, তাহলে আমরা উপকৃত হব, বাংলাদেশও উপকৃত হবে।’
শেষে র্যাফল ড্র অনুষ্ঠিত হয়। র্যাফল ড৶য়ের প্রথম পুরস্কার ছিল ইলেকট্রিক স্কুটার। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কার বিজয়ীরা পান যথাক্রমে রেফ্রিজারেটর ও টেলিভিশন। চতুর্থ পুরস্কার বিজয়ীর জন্য ছিল ঢাকা-সিলেট-ঢাকা বিমান টিকিট।
প্রথম আলো আনন্দমেলায় অন্য স্পনসরদের মধ্যে ছিল এসিআই, জা অ্যান্ড জি আইসক্রিম, টম ইয়াম, এয়ার এস্ট্রা, বাবুল্যান্ড, কেয়ার নিউট্রিশন, ইউনিভার্সেল মেডিকেল, কুমারিকা, মজো ও কাজী ফার্মস কিচেন।