নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা

নারী নির্যাতন একটি গুরুতর ও সংবেদনশীল সমস্যা, যা বাংলাদেশের সমাজে বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়। এই নির্যাতন শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক হতে পারে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণে নারী নির্যাতন ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।

ইসলাম নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং এই নির্যাতন প্রতিরোধে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।

১. পারিবারিক নির্যাতন: পারিবারিক পরিবেশে নারী নির্যাতন সবচেয়ে প্রচলিত। এর মধ্যে রয়েছে:

শারীরিক নির্যাতন: স্বামী, শ্বশুর–শাশুড়ি বা পরিবারের অন্য সদস্যদের দ্বারা মারধর ও শারীরিক নিপীড়ন। এটি নারীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে।

মানসিক নির্যাতন: অত্যধিক নিয়ন্ত্রণ, হুমকি, অপমান বা অবমূল্যায়নের মাধ্যমে নারীদের মানসিক অবসাদ, ভয় ও হতাশায় ফেলা হয়।

যৌতুকের কারণে নির্যাতন: যৌতুকের দাবিতে শ্বশুরবাড়িতে নারীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন একটি সাধারণ সমস্যা।

যৌন নির্যাতন: স্বামী বা পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যদের দ্বারা নারীর সম্মতি ব্যতীত যৌন নিপীড়ন।

সংসার ও সন্তানের দায়িত্বের চাপ: নারীদের ওপর সংসার পরিচালনা ও সন্তান লালন–পালনের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা।

২. পরিবারের বাইরে নির্যাতন: পরিবারের বাইরেও নারীরা বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হন:

যৌন হেনস্তা ও ধর্ষণ: রাস্তাঘাট, গণপরিবহন বা জনসমাগমে নারীরা যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হন। এটি বাংলাদেশে একটি মারাত্মক সমস্যা।

অনলাইন নির্যাতন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল বার্তা, ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমে হয়রানি ও ব্ল্যাকমেল নারীদের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায়।

কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন: গৃহকর্মী বা শ্রমিক হিসেবে কাজ করা নারীরা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। আইনি সুরক্ষার অভাবে এই সমস্যা আরও তীব্র হয়।

সামাজিক অবমাননা: পোশাক, আচরণ বা শখের কারণে নারীদের প্রতি অপমানজনক মন্তব্য বা গালাগাল।

৩. অর্থনৈতিক নির্যাতন: অনেক নারী আর্থিক স্বাধীনতার অভাবে নির্যাতনের শিকার হন। পুরুষেরা তাঁদের আয় বা সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ করে বা আর্থিকভাবে শোষণ করেন। এটি নারীদের মানসিক ও সামাজিক চাপে ফেলে।

৪. শ্রেণিভেদ ও সামাজিক বৈষম্য: দরিদ্র, সংখ্যালঘু বা অনগ্রসর শ্রেণির নারীরা শ্রেণিভেদ ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে অতিরিক্ত নির্যাতনের শিকার হন।

ইসলাম নারীদের সম্মান, অধিকার ও নিরাপত্তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নিম্নলিখিত নির্দেশনা উল্লেখযোগ্য:

১. নারীর সম্মান ও মর্যাদা: ইসলাম নারী ও পুরুষের সম্মানকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি মানুষকে সম্মানিত করেছি।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৭০)

নারীকে অপমান বা নির্যাতন করা ইসলামের নীতিবিরোধী। নারীর মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব।

২. পুরুষের দায়িত্ব ও সদাচরণ: ইসলাম পুরুষদের নারীদের রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার দায়িত্ব দিয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পুরুষেরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, কারণ আল্লাহ তাদের একে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা তাদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৪)

এই আয়াতে পুরুষদের নারীদের প্রতি সদাচরণ ও তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নারী নির্যাতন এই নির্দেশনার সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে–ই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’ (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ১,১৬২)

৩. নারীর অধিকার: ইসলাম নারীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে। নারীদের নিজস্ব সম্পত্তি ও আয়ের অধিকার রয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পুরুষদের জন্য তাদের উপার্জনের অংশ, আর নারীদের জন্য তাদের উপার্জনের অংশ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩২)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞানার্জন প্রত্যেক মুসলিম নর–নারীর জন্য ফরজ।’ (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৪)

এ ছাড়া নারীদের জীবনসঙ্গী নির্বাচনসহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

৪. নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান: ইসলাম নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মান, সম্পদ বা অন্য কিছুতে জুলুম করে, সে যেন বিচারের দিন আসার আগেই তা থেকে মুক্ত হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯)

নারীদের প্রতি যেকোনো ধরনের জুলুম বা নির্যাতন ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

৫. সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা: ইসলামের আলোকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন—

শিক্ষা ও সচেতনতা: নারীদের ইসলামি ও আইনি অধিকার সম্পর্কে শিক্ষিত করা।

আইনি সুরক্ষা: ইসলামি শাসনতন্ত্র অনুযায়ী নির্যাতনকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান।

পারিবারিক দায়িত্ব: পুরুষদের নারীদের প্রতি সদাচরণ ও তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎসাহিত করা।

সামাজিক সচেতনতা: সমাজে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি।

ইসলাম নারীদের সম্মান, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। কোরআন ও হাদিস নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করে এবং পুরুষদের নারীদের প্রতি সদাচরণের জন্য উদ্বুদ্ধ করে।

বাংলাদেশের সমাজে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলামি শিক্ষার প্রসার, আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে নারীরা নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে জীবন যাপন করতে পারবেন।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin