পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ৪৮ ঘণ্টার অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর সীমান্তে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে এক আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলায় অন্তত সাতজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
পাকিস্তানের পুলিশ কর্মকর্তা ইরফান আলি জানান, তালেবান-সংযুক্ত জঙ্গিগোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)–এর সদস্যরা উত্তর ওয়াজিরিস্তানের মির আলি শহরে একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। তিন জঙ্গি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। তবে সেনা হতাহতের বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এক আত্মঘাতী হামলাকারী বিস্ফোরকভর্তি গাড়ি নিয়ে পাকিস্তানি সেনার ক্যাম্পের দেয়ালে আঘাত হানে। এতে সাতজন সেনা নিহত ও ১৩ জন আহত হন। অন্য দুই জঙ্গিকে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি করে হত্যা করে।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ জানিয়েছে, এ হামলায় টিটিপির চারজন সদস্য নিহত হয়েছে। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও যুদ্ধবিরতি
বুধবার শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতিটি ছিল ২০২১ সালের পর দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর প্রথম শান্তিপূর্ণ বিরতি। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করার পর তালেবান ক্ষমতা দখল করে।
সম্প্রতি পাকিস্তান অভিযোগ করে বলেছে, আফগানিস্তানের ভেতর থেকে টিটিপি যোদ্ধারা পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। ইসলামাবাদ কাবুলকে এসব গোষ্ঠী দমন করার আহ্বান জানায়। অপরদিকে আফগান তালেবান সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পাকিস্তান ভ্রান্ত তথ্য ছড়িয়ে সীমান্ত উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং নিজ দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য আফগানিস্তানকে দোষারোপ করছে।
আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা
কাতার এই দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। পেশোয়ার থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক কামাল হায়দার বলেন, দোহায় একটি বৈঠকের বিষয়ে কথা চলছে। কিছু বন্ধুপ্রতিম দেশ যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তে পরিস্থিতি এখনও উত্তেজনাপূর্ণ। পাকিস্তান বলছে, আফগান পক্ষ তাদের উদ্বেগ সমাধান না করলে পরিস্থিতি যেকোনও সময় আরও খারাপ হতে পারে।
হামলা ও হতাহত
আফগান তালেবান সরকারের দাবি, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগের দিন পাকিস্তান কাবুলে দুটি ড্রোন হামলা চালায়। এতে পাঁচজন নিহত ও ডজনখানেক আহত হয় বলে স্থানীয় চিকিৎসকরা মার্কিন বার্তা সংস্থা এপিকে জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের আফগান সহায়তা মিশন (ইউএএনএএমএ) বৃহস্পতিবার জানিয়েছিল, চলতি সপ্তাহে পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষে আফগানিস্তানের ৩৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৪২৫ জন আহত হয়েছেন। পাকিস্তান পক্ষ থেকে বেসামরিক হতাহতের কোনও পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে, পাকিস্তানের দৈনিক ডন জানিয়েছে, দেশটির সেনাবাহিনীর আইএসপিআর দাবি করেছে, গত সপ্তাহে খাইবার পাখতুনখোয়ায় চালানো অভিযানে ভারত সমর্থিত সন্ত্রাসী সংগঠন ফিতনা-আল-খারিজ-এর অন্তত ৩৪ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর এ সংঘাত আবারও সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। যা পুরো অঞ্চলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে। ইতোমধ্যে ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও আল-কায়েদার মতো নিষিদ্ধ গোষ্ঠীগুলো সীমান্ত এলাকায় পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে, যা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয়ের জন্যই বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠছে।