পাল্টা হামলায় আগফানিস্তানের ১৯টি সীমান্ত ফাঁড়ি দখলের দাবি পাকিস্তানের  

পাল্টা হামলায় আগফানিস্তানের ১৯টি সীমান্ত ফাঁড়ি দখলের দাবি পাকিস্তানের  

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠেছে। আফগান বাহিনীর গুলিবর্ষণের পর পাল্টা হামলায় পাকিস্তানি সেনারা আফগানিস্তানের ভেতরে একাধিক সীমান্ত পোস্ট ধ্বংস করে ১৯টি পোস্ট দখল করেছে বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ। এতে বিপুলসংখ্যক আফগান সেনা ও জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী। এর আগে আফগানিস্তান দাবি করেছিল, তাদের হামলায় পাকিস্তানের অন্তত ৫৮ সেনা নিহত হয়েছে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ এ খবর জানিয়েছে।

রবিবার জিও নিউজকে গোয়েন্দা সূত্র জানায়, শনিবার গভীর রাতে আঙ্গুর আড্ডা, বাজৌর, কুররম, দির, চিত্রাল ও বারামচাসহ একাধিক সীমান্তপথে আফগান বাহিনী বিনা উসকানিতে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করা সশস্ত্র খারেজি গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করা।

সূত্রগুলো জানায়, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সীমান্ত চৌকিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা হামলা চালায়। কামান, ট্যাংক, ড্রোন ও বিমান সহায়তায় পরিচালিত ওই হামলায় দোরান মেলা, তুর্কমানজাই ও শাহিদানসহ বহু আফগান পোস্ট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। কুররম, জানদোসার ও নওশকির ঘজনালি ঘাঁটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

পাকিস্তানি বাহিনী আঙ্গুর আড্ডার এক আফগান পোস্টে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছে বলেও সূত্রটি জানিয়েছে। খারলাচি, কুনার ও চাঘাই এলাকায় পরিচালিত অভিযানে এক ডজনের বেশি তালেবান ও খারেজি যোদ্ধা নিহত হয়।

আরও পড়ুন: ৫৮ পাকিস্তানি সেনা হত্যার দাবি আফগানিস্তানের, সীমান্ত বন্ধ

আফগান ‘আগ্রাসনের’ নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি বলেছেন, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ একক কোনও দেশের নয়, বরং আঞ্চলিকভাবে এর দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি কামনা করি। তবে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনও আপস নয়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আফগান বাহিনীর হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ মন্তব্য করে সেনাবাহিনীর ‘দৃঢ় ও কার্যকর’ জবাবের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় কোনও ছাড় দেওয়া হবে না। প্রতিটি উসকানির যথাযথ জবাব দেওয়া হবে।

শাহবাজ আরও জানান, আফগান মাটিতে অবস্থান নেওয়া ফিতনা আল-খারেজি ও ফিতনা আল-হিন্দুস্তান নামের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে ইসলামাবাদ ইতোমধ্যে কাবুলকে তথ্য দিয়েছে। তালেবান প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের ভূমি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না।

পাকিস্তানি গোয়েন্দা সূত্রগুলোর দাবির বরাতে জিও নিউজ লিখেছে, অভিযানে আফগান বাহিনীর মানোজাবা ব্যাটালিয়নের সদর দফতর ধ্বংস করা হয়েছে। ব্রাবচা অঞ্চলে দুররানি ক্যাম্প ১ ও ২ পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে অন্তত ৫০ তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, পাকিস্তানি বাহিনী আফগান পোস্টে হামলা চালানোর সময় পোস্টগুলোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দাবি, এই অভিযান আফগান জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং সীমান্তপারের সন্ত্রাসী ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে। বেসামরিক এলাকা বা সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি আফগান হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আফগানিস্তান আমাদের শত্রু রাষ্ট্রের প্রভাবে বিপজ্জনক খেলায় নেমেছে। তবে পাকিস্তান আগুনের খেলায় জবাব দেবে আগুন দিয়েই।

আরও পড়ুন: তালেবান মন্ত্রীর ভারত সফর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের উপজাতীয় নেতারা সেনাবাহিনীর প্রতি সংহতি জানিয়ে বলেছেন, আমরা বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ব। যারা দেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলবে, তাদের আর কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।

ধর্মীয় নেতা মাওলানা তাহির আশরাফি এক ভিডিও বার্তায় আফগান সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, পাকিস্তান কোনও পরাশক্তি নয়, কিন্তু আমাদের ধৈর্য সীমিত। আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের অবসান না ঘটলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

সীমান্তে সংঘর্ষের পর সৌদি আরব, ইরান ও কাতার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে সংযম ও সংলাপের মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য উত্তেজনা কমানো অপরিহার্য।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বকায়ি বলেন, দুই দেশের মধ্যে তাৎক্ষণিক সংলাপই এখন জরুরি। প্রয়োজনে তেহরান মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একই আহ্বান জানিয়ে বলেছে, সীমান্ত সংঘাত পুরো অঞ্চলের শান্তিকে বিপন্ন করতে পারে।

আরও পড়ুন: আফগানিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে ভারত

তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর ২০২১ সাল থেকে পাকিস্তানে সীমান্তপারের হামলা ও সন্ত্রাসী তৎপরতা বেড়েছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করছে, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) তাদের দেশে হামলা চালাচ্ছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পর্যবেক্ষণ দলও সম্প্রতি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আফগান তালেবান প্রশাসন টিটিপিকে লজিস্টিক ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে।

পাকিস্তান চার দশকের বেশি সময় ধরে আফগান শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে। তবে ২০২৩ সালের পর থেকে অননুমোদিত আফগানদের ফেরত পাঠানো শুরু করেছে ইসলামাবাদ। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ ৫৪ হাজার আফগানকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin