বিশ্ব প্রবীণ দিবস ১ অক্টোবর। জাতিসংঘ এ বছর এই দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে—‘আমাদের আকাঙ্ক্ষা, সুস্থতা এবং অধিকার রক্ষায়: প্রবীণ ব্যক্তিরা স্থানীয় ও বৈশ্বিক কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন’। এই প্রতিপাদ্য শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং সমাজে প্রবীণদের প্রকৃত ভূমিকা এবং তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি আহ্বান।প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বাস্তবতাবিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৫ সালে যেখানে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ছিল ৫৪.১ কোটি, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ কোটিতে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা হবে ২১০ কোটি। বৈশ্বিক গড় আয়ু এখন ৭৩.৫ বছর, যা ১৯৯৫ সালের তুলনায় ৮.৬ বছর বেশি। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার খেলা নয়—এটি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর, যা প্রবীণদের ভূমিকা পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।বাংলাদেশেও এই চিত্র ভিন্ন নয়। দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু তাদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রবীণ জনগোষ্ঠী রয়েছে প্রায় দেড় কোটি এবং আমাদের গবেষণা বলছে ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা হবে ৩ কোটি। শুধু গ্রহীতা নয়, পরিবর্তনের কারিগরএ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয়ের মূল বার্তা হলো—প্রবীণরা সমাজের নিষ্ক্রিয় সদস্য নন, তারা সক্রিয় অবদানকারী। তারা জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার ভাণ্ডার। সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। অনেক প্রবীণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন, সন্তান-নাতি-নাতনিদের দেখাশোনা করেন, কমিউনিটি সেবায় নিয়োজিত থাকেন এবং সমাজ পরিবর্তনে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখেন।প্রবীণদের আকাঙ্ক্ষা, সুস্থতা এবং অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের মতামত শুনতে হবে, নীতি-নির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রবীণদের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা মানে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সঙ্গত এবং টেকসই সমাজ গড়া।চ্যালেঞ্জ ও করণীয়প্রবীণদের বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়— বয়সভিত্তিক বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারের অভাব, আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং কখনও কখনও পারিবারিক অবহেলা ও নির্যাতনও। এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ।সরকারের দায়িত্ব: প্রবীণদের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ব্যবস্থা, বয়স্ক ভাতা সম্প্রসারণ এবং বয়সবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বয়সভিত্তিক বৈষম্য রোধে আইন ও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।পরিবার ও সমাজ: পরিবারে প্রবীণদের মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করা এবং তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে মূল্য দেওয়া জরুরি। আন্ত-প্রজন্ম সংযোগ তৈরি করে তরুণদের সঙ্গে প্রবীণদের সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে হবে।স্বাস্থ্য ও সেবা খাত: প্রবীণদের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষায়িত জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। বয়স্ক নিবাস ও পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোর মান উন্নয়ন করতে হবে।কর্মক্ষেত্র: প্রবীণদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে কর্মক্ষেত্রে তাদের অবদানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বয়সবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।মর্যাদার সঙ্গে বার্ধক্যপ্রবীণ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বার্ধক্য জীবনের একটি স্বাভাবিক পর্যায়, এটি কোনও দুর্বলতা নয়। বরং এটি অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং সাফল্যের প্রতীক। একটি সভ্য সমাজের মাপকাঠি হলো সেই সমাজ তার প্রবীণদের কতটা মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের সুযোগ দিচ্ছে।বাংলাদেশের ঐতিহ্যে পিতামাতা ও প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সেবার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের এই মূল্যবোধকে শুধু রক্ষাই নয়, বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। প্রবীণরা আমাদের শিকড়, তাদের রক্ষা করা মানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত তৈরি করা।এগিয়ে যাওয়ার পথজাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে প্রবীণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য ও সুস্থতা (এসডিজি ৩), বৈষম্য হ্রাস (এসডিজি ১০) এবং টেকসই নগর ও সমাজ (এসডিজি ১১)—এসব লক্ষ্যেই প্রবীণদের অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য।আসুন, এই বিশ্ব প্রবীণ দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই—প্রবীণদের কণ্ঠস্বরকে শোনার, তাদের অধিকার রক্ষার এবং তাদের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করার। একটি বয়সবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে প্রতিটি প্রবীণ মানুষ মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সুখের সঙ্গে তাদের জীবনের এই অধ্যায় অতিবাহিত করতে পারেন।প্রবীণরা শুধু আমাদের অতীত নন—তারা আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের নেতৃত্ব, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় আমরা গড়তে পারি এক অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সঙ্গত এবং মানবিক সমাজ।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষক; উপ-পরিচালক, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ, রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটাল (জেবিএফআরএইচ)।