জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যখন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় এককক্ষীয় সংসদ রাখার পক্ষে মত দিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি মনে করে, বর্তমান ব্যবস্থার দুর্বলতা কাটানো না গেলে উচ্চকক্ষ গঠন করেও সংসদে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ কি জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারবে?’ শীর্ষক এক জাতীয় সংলাপে এ মত দেয় সিপিডি। অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা।
সংলাপে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নিজাম আহমদ।
ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “২০২৪ সালে রাজনৈতিক উত্তরণের পর জনগণের মূল চাওয়া ছিল—সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ওপর কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। গত ৫০ বছরে ওয়েস্টমিনস্টার মডেল বাংলাদেশে যথাযথভাবে কাজ করেনি।”
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “বিরোধী দলের নেতৃত্বে সংসদীয় কমিটি গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তনসহ নানা সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। ফলে কেবল উচ্চকক্ষ যোগ করলেই কাঠামোগত সমস্যা দূর হবে না।”
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, “১৮৬২ সালের বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল থেকে ১৯৭২ সালের সংবিধান পর্যন্ত এই ভূখণ্ড ছিল ভাষা ও সংস্কৃতিতে একক ও সমজাতীয়। তাই একক সংসদই এখানে বেশি প্রাসঙ্গিক।”
সংসদের কার্যক্রম নিয়ে তিনি বলেন, “সংসদ এখন আইন প্রণয়নের চেয়ে আইন পাসের স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি বিল পাসে রাজনৈতিক বাধা ও দলীয় চাপ প্রবল। সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যক্রমও অকার্যকর—প্রয়োজনীয় তিন হাজার বৈঠকের বিপরীতে বছরে গড়ে ১২টি বৈঠক হয়। তদারকি ও জবাবদিহি উভয়ই দুর্বল।”
গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, “এমন কাঠামোর মধ্যে দ্বিকক্ষীয় সংসদ প্রবর্তন করলেও কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে না। বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন জরুরি, না হলে কোনও ব্যবস্থাই টিকবে না।”
তবে সংলাপে ভিন্নমত প্রকাশ করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, “২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। তখন উচ্চকক্ষ ও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব থাকলে আওয়ামী লীগ পেতো প্রায় ১৪৪টি আসন, আর বিএনপি পেতো অন্তত ৯৩টি। উচ্চকক্ষ থাকলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পঞ্চদশ সংশোধনীও পাস করা কঠিন হতো।”
সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. রওনক জাহানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে বিএনপি, এনসিপি ও গণসংহতি আন্দোলনের নেতারাও অংশ নেন।