সরীসৃপতন্ত্র

সরীসৃপতন্ত্র

তেলরঙের ছবির মতো ঘোর

তোমার চোখে ঘুম নেই, মোকাম। বেশ কিছুদিন ধরে তোমার ঠিকঠাক ঘুম হয় না। চোখ যখন-তখন জড়িয়ে আসে। চোখের সামনে যা দেখছ, তা আদৌ দেখছ কি না, সন্দেহ হয়। সন্দেহ হয় বাস্তব নিয়ে, অবাস্তব নিয়ে। সন্দেহ হয়, বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝে দ্বন্দ্ব সৃষ্টিকারী ক্ষীণ-ধূসর রেখাটিকে নিয়ে। সন্দেহ হয়, কারণ, তুমি জানো, বর্তমান বলে কিছু নেই। যা ঠিক এই মুহূর্তটিতে বর্তমান, তা চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই অতীত। বর্তমান বলে যদি কিছু না-ই থাকে, সবই যদি অতীতের করাল গ্রাসে লুপ্ত হয়ে চলে ক্রমাগত, তবে ভবিষ্যতের চোখে চোখ রেখে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ানোরও কোনো উপায় থাকে না। অথচ কী অবাক করা কাণ্ড, মানুষের যাবতীয় দুর্ভাবনা তার ভবিষ্যৎকে ঘিরেই। এমনই এক পৃথিবীর নড়বড়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে মানুষ ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন দেখে, যেখানে রাতের আকাশে প্রবলভাবে জ্বলজ্বল করতে থাকা তারাটিও নিভে গেছে লক্ষ বছর আগে। তোমার তো সন্দেহ না করে উপায় নেই, মোকাম।

এই যে তুমি দাঁড়িয়ে আছ এখানে দুপায়ে ভর দিয়ে, তা তুমি সত্যিই দাঁড়িয়ে আছ, না স্বপ্ন দেখছ দাঁড়িয়ে থাকার—তুমি নিশ্চিত হতে পারো না। শুধু টের পাও, কোথাও কোনো আওয়াজ নেই। প্রাণের কোনো স্পন্দন নেই। সামনে কেবলই ঘন কুয়াশা। কুয়াশায় বুঁদ হয়ে থাকা আস্ত এক পৃথিবী। তারপর হঠাৎ করেই আবিষ্কার করো, তোমার পা দুটো চলতে আরম্ভ করেছে। হাঁটছ তুমি। তোমার পরিপার্শ্বের ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত নও, তবে ইন্দ্রিয়গুলো একযোগে বলছে, পায়ের মাপে কোনো ভুল নেই। ভুল নেই হাঁটার অভিমুখে।

কুয়াশার মশারি নড়ে ওঠে, সরে সরে যায়। হঠাৎ ঝিলমিলিয়ে ওঠে ঘাসের ডগায় থির হয়ে থাকা ফোঁটা ফোঁটা শিশির। মাথার ওপর স্থবির, অনড় গাছের শাখাপ্রশাখা। ঝোপেঝাড়ে ফুটে আছে নাম না-জানা নীল, গোলাপি, বেগুনি ফুল। তবে তোমার চোখে ঘুমের অভাব, মস্তিষ্ক ধোঁয়াশাচ্ছন্ন; ফলে, দৃশ্যকল্পের নান্দনিকতা বিচারে অক্ষম তোমার চোখে রঙিন ফুলগুলো ধরা পড়ে ত্রিমাত্রিক তৈলচিত্রের ক্যানভাসে জেড অক্ষ বরাবর উঠে আসা একগুচ্ছ রঙের পুঁটুলি হিসেবে। সীমাহীন ধূসরতার মাঝে ওই অতটুকুই প্রাণের স্পন্দন, রঙের ছোঁয়া। মেঘহীন আকাশে ঝুলে আছে থকথকে ডিমের কুসুমের মতো নিস্তাপ সূর্য। তার কুসুম কমলা আভা, গলিত লাভার মতো তরল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর মাটিতে, আর দূরের কুয়াশা একটু একটু করে শুষে নিচ্ছে সে রং। মনে হচ্ছে, কোথায় যেন আগুন লেগে গেছে। পৃথিবী কমলালেবুর মতো গোল—এটা বৈজ্ঞানিক সত্য। কিন্তু পৃথিবীকে সামনাসামনি দেখতেও যে এতটা গোল লাগা সম্ভব, আজকের আগে তুমি তা উপলব্ধি করোনি কখনো। পায়ের পাঁচ-পাঁচ দশ আঙুল দিয়ে মাটি খামচে ধরে ধরে পা টিপে টিপে এগোতে হচ্ছে তোমার, যেন মুহূর্তের অসতর্কতায় মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে। হঠাৎ জলজ কোনো পাখির জল ছেনেছুঁয়ে ডানা ঝাপটে উড়ে যাবার শব্দ ছাড়া পৃথিবীতে এ মুহূর্তে কোথাও কোনো আওয়াজ নেই।

এভাবেই তুমি, মোকাম মাহমুদ, এক স্থির-অনড়-নিস্তব্ধ পৃথিবীর বুক চিরে হাঁটতে থাকো। তুমি হাঁটো, কেননা, মানুষের ইতিহাস দিন শেষে হাঁটারই ইতিহাস। তুমি হাঁটো, কারণ, মানুষের না হেঁটে উপায় নেই। চাকা হয়ে জন্মালে যেমন গড়াতেই হয়, ডানা নিয়ে জন্মালে যেমন না উড়ে উপায় নেই, তুমি তেমনি দুটো পা নিয়ে জন্মেছ, মোকাম; পায়ের ধর্ম হাঁটা, হাঁটতে থাকা, হেঁটে চলা। হাঁটতে হাঁটতে নতুন নতুন দেশ মহাদেশের আবিষ্কার। ভাষা, সংস্কৃতির আদান-প্রদান। নতুন নতুন সভ্যতার জন্ম। হাঁটার অর্থ নতুন সম্ভাবনার দরজায় টোকা দেওয়া। হাঁটা মানে মানুষের স্থবির বাস্তবতার বদল। সঞ্চালিত দুটি পা টাইম মেশিনের মতো, যা হাঁটতে থাকা মানুষকে উপস্থিত করে বাস্তবতার সমান্তরাল অপর এক বাস্তবতায়। হাঁটার অভ্যাস পরিত্যাগ মানে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় সভ্যতার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া। ফলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল সভ্যতার ফসিলাইজেশন এবং/অথবা মৃত্যু। তুমি তো এসবই জানো, মোকাম। তুমি এ-ও জানো যে মানুষের হন্টনরত পাকে ভোট হিসেবেও গণনা করা হয়। ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনীর আক্রমণে আক্রান্ত তোমার দেশের কত অজস্র মানুষ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছিল সীমান্ত। ওটাই ছিল পাকিস্তান নামক এক ভুল ভৌগোলিক সমীকরণের বিরুদ্ধে এ ভূখণ্ডের মানুষের চূড়ান্ত ‘না’ ভোট। কোনো ব্যালট পেপার বা ভোট বাক্সও সে কাজ করতে পারেনি, কোটিখানেক মানুষের হন্টনরত পা যতটা স্পষ্টতার সাথে তাদের পাঞ্জাবি হানাদারবিরোধী অবস্থানকে তুলে ধরেছে। তাই তুমি হাঁটছ, মোকাম। হাঁটতে কখনো খারাপ লাগেনি তোমার।

তবে যে প্রশ্ন তোমাকে বরাবরই ভুগিয়েছে তা হলো, কোন পথে হাঁটবে তুমি? কোন পথে হাঁটলে জীবনের একটা অর্থ তৈরি হয়? প্রশ্নগুলো তোমায় ভুগিয়েছে, কারণ, এদের কোনো নৈর্ব্যক্তিক উত্তর হয় না। কেউ রোদগলা পিচঢালা পথে হেঁটে আরাম পায়। কারও প্রশান্তি সোঁদা মাটির গন্ধমাখা ভেজা ঘাস মাড়িয়ে। কেউ এমন পথে হাঁটে, যে পথে হাঁটে সবাই। পরিচিত পথ, ফলে বিপদের শঙ্কা কম। আবার কেউ খুঁজে খুঁজে এমন পথ বের করে, যেখানে আগে কোনো জনমানুষের পদচিহ্ন পড়েনি। যে রাস্তা পদে পদে বিপৎসংকুল, কিন্তু প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। এভাবে হেঁটে হেঁটে সবাই যে যার মতো করে জীবনের অর্থ রচনা করতে থাকে।

তোমার পা দুটো আজও তোমাকে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় নড়বড়ে, শিশিরে ভেজা, পিচ্ছিল সে লোহার পোলের সামনে। কুয়াশার হাহাকার ভেদ করে, পোলের এপার থেকে আজও তুমি দেখতে পাও ওপারের সেই টিলা, শৈশবে যে টিলায় লাফিয়ে লাফিয়ে চড়ে যেতে তোমার সময় লাগত সাকল্যে দুই মিনিট। যে টিলার ওপরে উঠে দাঁড়ালে পুরো মহল্লার সামগ্রিক একটা অবয়ব ফুটে উঠত চোখে, আর তুমি টের পেতে শুধু এই মহল্লা নয়, তুমি পাখির চোখে দেখতে চাও গোটা পৃথিবীটাকেই। টের পেতে এই টিলায় চড়ে তোমার সে স্বপ্ন পূরণ হবার নয়, তোমার চড়তে হবে আরও উঁচু কিছুতে। পারলে খরিদ করে ফেলতে হবে উঁচু এক পাহাড়। এই টিলার ওপর চড়েই তোমার জীবনে প্রথমবারের মতো পাহাড় খরিদ করবার অভিলাষ বুকে জন্ম নেয়। তোমার শৈশবের স্মৃতিগন্ধা সে টিলার ওপর গোটা অঙ্গে ফুল ধারণ করা এক কৃষ্ণচূড়াগাছ। আর সে গাছের ঠিক মাথার ওপর ঝুলে আছে রঙিন বেদানার মতো নিস্তাপ সূর্য। শৈশবের স্মৃতি, স্বাদ, আর গন্ধমাখা দৃশ্যটি তোমার ভালো লাগে। তুমি আবারও তোমার ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের ওপর ভরসা করে পুলের ওপর, কুয়াশার পেটে ঢুকে পড়ো। জায়গায় জায়গায় নরম হয়ে আসা, এখানে-ওখানে ছোট ছোট গর্ত সৃষ্টি হয়ে যাওয়া এ জংধরা সেতু তুমি ছাড়া সম্ভবত আর কেউ ব্যবহার করে না। হোক ভাঙাচোরা, তবু পৃথিবীতে এই একটি রাস্তা কেবলই তোমার। কেবল তুমি তাকে চেনো, তুমি তাকে ব্যবহার করো।

অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে, ঠিক কতক্ষণ পর, তা গণনা করা সম্ভব হয় না, তুমি পুল পেরিয়ে ওপারে গিয়ে নামো। শামুকের সংসারের সর্বনাশ করে, নরম কর্দমাক্ত মাটি পায়ে মাড়িয়ে ছুটে গিয়ে হাজির হও টিলাটার কাছে। হ্যাঁচড়প্যাঁচড় করে উঠতে শুরু করো টিলার ওপর। উঠতে উঠতে টের পাও ছোটবেলার সে গতি আর নেই তোমার পায়ে। হাড়ে-মাংসে জং ধরেছে। এভাবে কিছুদূর ওঠার পর কুয়াশার রং যেখানে আগুন-কমলা পেরিয়ে অসুস্থ হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে, সেখানে এসে থেমে যাও তুমি। এই তো, তোমার ঠিক সামনে সে কৃষ্ণচূড়াগাছ। বাতাস নেই কোনো, তবু ডানে-বামে দুলছে তার শাখাপ্রশাখায় ঝুলে থাকা কালচে লাল কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো। গাছের ঠিক নিচে, ছায়াঘেরা জমিন এবড়োখেবড়ো, বালি বালি। সেখানে অনেকটা জায়গাজুড়ে ঝরে পড়া ফুলের লালগালিচা বিছিয়ে রাখা। তোমার দুঃখ হয়। বড় দুর্ভাগা সে ফুল, যে জানে না কার জন্য তার ঝরে পড়া। ফুলগুলো ডিঙিয়ে পায়ে পায়ে হেঁটে চলে আসো তুমি গাছের কাছাকাছি। অনেকখানি পথ হেঁটে তুমি ক্লান্ত। মনস্থির করো গাছের ছায়ায় বসে একটু জিরিয়ে নেবার। এখন অপেক্ষা এই কুয়াশার কেটে যাবার। কুয়াশা সরলেই তোমার লক্ষ্য পূর্ণ হবে। এই টিলার ওপর, এই গাছের নিচে এসে দাঁড়ালেই সেই বাড়িটা দেখা যায়, যাতে তোমার জন্ম, যাতে কেটেছে তোমার শৈশব।

ক্লান্ত শরীরে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসামাত্রই এক তীব্র ঝাঁজালো গন্ধ এসে তোমার নাকে ধাক্কা দেয়। গন্ধটা পরিচিত এবং তোমার শৈশবের স্মৃতির সঙ্গেই রিফু করা। নাকের ডগায় এসে গন্ধটা টোকা দেওয়ামাত্র তোমার সমস্ত শরীরে যে চনমনে ভাবের সৃষ্টি হয়, তাতে তুমি বুঝতে পারো যে একসময় এ বস্তু তোমার খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু এ মুহূর্তে, এ জায়গায়, এই মানসিক অবস্থায় তুমি স্মরণ করতে পারো না ঠিক কিসের গন্ধ এটা। শরীরজুড়ে প্রবাহিত শীতল ক্লান্তির স্রোত তোমাকে স্মৃতির ঝুলি হাতড়ে উত্তর খুঁজে বের করতে বাধা দেয়, তুমি মাটির ওপর হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়ো এবং ঠিক তখনই তোমার হাতে একটা কাচের বোতলের স্পর্শ এসে লাগে। তুমি চমকে ওঠো। তাকিয়ে দেখতে পাও গাছের গুঁড়ির সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখা আছে বিশাল এক স্যাভলনের কাচের বোতল। সাধারণ বোতলের চেয়ে আকারে অন্তত বিশ গুণ বড়। একজনে টেনে সরানো যাবে না, দুজন মিলে নড়াতে গেলেও দম বেরিয়ে যাবে। ভোঁতা বিস্ময়ে বিপন্ন তুমি পুনরায় গুঁড়িতে মাথা রেখে হেলান দিয়ে বসতে গিয়ে আবিষ্কার করো, গাছের ছায়ায় মাটির ওপর এতক্ষণ নির্জীব হয়ে শুয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলোর সরু সরু পিলপিলে পা গজিয়েছে। তারা ধীরগতিতে হেঁটে বেড়াচ্ছে এদিক-সেদিক। আচমকা ধেয়ে আসা হিমেল হাওয়ার প্রবাহ তোমার কানে সপাটে চড় কষালে তুমি সংবিৎ ফিরে পাও, তোমার স্মরণ হয় যে শীতকালে কখনো কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটে না। তোমার ভ্রম ভাঙে। চেয়ে দেখো ওরা ফুল নয়, বরং মাজাভাঙা, দোমড়ানো-মোচড়ানো অসংখ্য লালপিঁপড়ে। সবগুলোই হাত-পা-পেট উল্টে ভেটকিয়ে মরে পড়ে থাকার ভঙ্গিমায় ছিল এতক্ষণ। তার কারণও তোমার চোখে নতুন করে ধরা পড়ে।

পিঁপড়েদের চারপাশে খন্দকের মতো খোদাই করা ছোট ছোট বৃত্তাকার গর্তে গাঢ় হলুদ রঙের তরল স্যাভলন বোঝাই। শৈশবে, তোমার বয়স যখন পাঁচ কি সাত, ঘরে লালপিঁপড়ের সংখ্যা বেড়ে গেলে তুমি পিঁপড়ের আস্তানার চারপাশে স্যাভলন ছিটিয়ে দিতে ঠিক এমনিভাবে, গোল করে। কোনো পিঁপড়েই সে স্যাভলনের ঘেরে অনন্তকাল বসে থাকতে রাজি হতো না। ক্ষুধায়, তেষ্টায় অথবা স্যাভলনের ঝাঁজালো ঘ্রাণে মাথা বিগড়ে গেলে শেষমেশ ঝাঁপিয়ে পড়ত স্যাভলনের ওপরে। সাঁতরে পার হবার চেষ্টা করত। কিন্তু শেষমেশ একটা পিঁপড়েও নিজেকে সেই মরণঘের থেকে রক্ষা করতে পারত না। তড়পে তড়পে মারা যেত। ঘেরের বাইরে বসে তুমি নিজেকে মনে করতে মধ্যযুগীয় বীর। মনে মনে উপভোগ করতে শত্রুপক্ষের দুর্গ ঘেরাও দেওয়ার আনন্দ। উপভোগ করতে এই খুদে প্রাণীগুলোর জীবনে রোজ কেয়ামত ডেকে আনার ঐশ্বরিক ক্ষমতা। শৈশবের সে অবোধ নৃশংস ক্রীড়ার অনুষঙ্গসমূহ নিজের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখে তোমার মনে আবারও ঘাই দিয়ে যায় তোমার বাড়ির কথা। তোমার শৈশবের সে বাড়ি, যে বাড়ির বারান্দায় তুমি কাটিয়েছ তোমার তুলনামূলক নিষ্পাপ জীবনের অসংখ্য অগণিত দিবস ও রাত্রি। যে বাড়ির উঠোনজুড়ে তোমার বাবা ফুলগাছের চারা বুনতেন, আর রমিজ কাকু তাতে দিতেন পানি আর সার। যে বাড়ির দোতলার এক কামরা থেকে ভোরবেলা মায়ের রেয়াজের ধ্বনি অনুরণিত হতো চারদিকে, কখনো আহির ভায়রো, কখনো বিলাসখানি তোড়ি, কখনো বসন্ত মুখারি রাগের করুণ রসে জারিত হতো দিগ্বিদিক। সেই বারান্দা আর উঠোন, যেখানে তুমি শুয়ে-বসে আকাশ দেখেছ অজস্র দিন, তাতে ভেসে বেড়ানো মেঘের মাঝে আবিষ্কার করেছ শুঁড়তোলা হাতি, খেপা ষাঁড় আর প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসর, তারপর তোমার সুখের দিবাস্বপ্নে আক্রমণ হানা বিষপিঁপড়ের ঝাঁকের কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে স্যাভলন-সহযোগে তাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছ শনৈ শনৈ। সে বাড়ির উঠোনে কাটানো জীবনের সোনালি দিনগুলো যেমন তোমার কাছে অতীত স্মৃতি, তেমনি তুমি নিজেও সে বাড়ি, সে উঠোনের কাছে ইতিহাসের অতীত কুশীলবদের একজনমাত্র। যে ইতিহাস এবং অতীত আর কেউ জানে না। তুমি ছাড়া যে ইতিহাস আর কারও কাছে প্রাসঙ্গিকও নয়। তোমার উপলব্ধি হয়, মানুষের গোটা জীবনটাই আসলে মুছে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতির সমষ্টিমাত্র।

আরও কিছুক্ষণ এসব রোমান্টিক চিন্তাভাবনায় ডুবে থাকা হয়তো অসম্ভব ছিল না তোমার জন্য, কিন্তু তুমি আতঙ্কিত হয়ে লক্ষ করো যে মাথার ওপর গোটা গাছটার ডাল-লতাপাতা আঁকড়ে ধরে ঝুলে আছে শত শত বিষপিঁপড়ে। এগুলো একটাও ফুল ছিল না, আবারও তুমি তোমার ভ্রমের শিকার হয়েছ। শৈশবে যেসব পিঁপড়ে তুমি দুহাতে কিংবা পায়ের নিচে কচলে মেরেছ, হত্যা করেছ স্যাভলনে ডুবিয়ে, এরা হয়তো তাদেরই প্রেত। হয়তো তারা প্রতিশোধ নিতে এখনই বৃষ্টির মতো টুপটুপ করে ঝরে পড়বে তোমার শরীরে। কামড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলবে তোমাকে। তীব্র আতঙ্কে তোমার গোটা শরীর জমে যায়, তবু তুমি স্রেফ মনের জোরে উঠে দাঁড়াও। আবারও সচল হয়ে ওঠে তোমার পা। পড়ে থাকা স্যাভলনের বোতল, স্যাভলনের নদী, কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতো কালচে লাল মাজাভাঙা পিঁপড়েদের ডিঙিয়ে তুমি ছুটতে আরম্ভ করো। তোমার পা জোড়া আবারও হয়ে ওঠে টাইম ট্রাভেল মেশিন। একবার কেবল পিছু ফিরে চাও। কুয়াশা এখনো অসুস্থ হলুদ বর্ণ এবং ঘোলা। তোমার শৈশবের বাড়িটার দেখা আজও মিলল না। চলবে

Comments

0 total

Be the first to comment.

অ্যান্টি লাইব্রেরি BanglaTribune | ধারাবাহিক

অ্যান্টি লাইব্রেরি

বইয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা অনেকটা আসক্তির মতো। বইয়ের দোকানে ঘুরতে গেলে প্রায়ই কম করে হলেও তিনটি বই ক...

Oct 16, 2025
অভিনয়  BanglaTribune | ধারাবাহিক

অভিনয় 

এখন তো মনের মতো সঙ্গী পেয়েছি। ইচ্ছে মতো খাই, দাই, ঘুরে বেড়াই। মনের সব ইচ্ছে পূরণ করছি। আমি দেখেছি, ও...

Sep 16, 2025

More from this User

View all posts by admin