ট্রাম্পের নতুন ফিলিস্তিন পরিকল্পনা: অগ্রগতি নাকি কূটনৈতিক মরীচিকা?

ট্রাম্পের নতুন ফিলিস্তিন পরিকল্পনা: অগ্রগতি নাকি কূটনৈতিক মরীচিকা?

দুই বছরের গাজা যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আবারও ভেসে উঠেছে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন ফিলিস্তিন পরিকল্পনাকে কেউ দেখছেন ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে, আবার কেউ বলছেন এটি কেবল আরেকটি মরীচিকা।

মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউজের ২১ দফা পরিকল্পনা আঞ্চলিক নেতাদের কাছ থেকে নীতিগত সমর্থন পেয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত নিউইয়র্ক ঘোষণার সঙ্গে এই মার্কিন পরিকল্পনার বিস্তর মিল রয়েছে।

মিল খোঁজা হচ্ছে দুই পরিকল্পনায়

ট্রাম্প প্রশাসন ও জাতিসংঘ সমর্থিত পরিকল্পনা উভয়েই গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক স্থানচ্যুতি প্রত্যাখ্যান করেছে। কুখ্যাত ‘ট্রাম্প রিভিয়েরা’—যার অর্থ জোরপূর্বক বা স্বেচ্ছা দেশত্যাগ—কোনও পক্ষই সমর্থন করছে না। উভয় পরিকল্পনায় ভবিষ্যৎ শাসনে হামাসের ভূমিকা নেই, তবে সংগঠনটিকে সরাসরি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও নেই। শর্ত হচ্ছে, হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে।

পশ্চিম তীরে নতুন করে ভূমি দখল বা সংযুক্তি বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতিও উভয় পরিকল্পনায় মিলছে। আরব দেশগুলোর বিনিয়োগ পেতে হলে ট্রাম্পকে স্পষ্টভাবে এ প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। ম্যাক্রোঁর ভাষ্যমতে, এ বিষয়ে ট্রাম্প ইতোমধ্যে নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন।

অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ কে পরিচালনা করবে?

সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাব হচ্ছে গাজায় একটি আন্তর্জাতিক অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ গঠন। ধারণা করা হচ্ছে, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে এ কর্তৃপক্ষের প্রধান করা হতে পারে, যিনি পাঁচ বছর মেয়াদে গাজার প্রশাসনিক ও আইনগত দায়িত্ব সামলাবেন।

তবে নিউইয়র্ক ঘোষণায় প্রস্তাব করা হয়েছে মাত্র এক বছরের জন্য একটি টেকনোক্র্যাটিক প্রশাসন, এরপর পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেম মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনি সরকার গঠনের। প্রশ্ন হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র মাহমুদ আব্বাসকে নিউইয়র্ক ভ্রমণেই নিষেধ করেছে, তারা কীভাবে শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (পিএ) নেতৃত্বে বসাবে?

সংস্কারের শর্ত

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতা নিতে হলে কঠোর সংস্কারের শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন, প্রার্থীদের ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করা, রাজনৈতিক বন্দিদের ভাতা বন্ধ করা এবং পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা। ২০০৬ সালের পর আর কোনও সংসদীয় নির্বাচন হয়নি ফিলিস্তিনে। আব্বাসের সমালোচকেরা বলছেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতাদের বাইরে রাখছেন।

বিতর্কিত বিষয়গুলো

জাতিসংঘ পরিকল্পনায় পুনর্গঠনে ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-এর কেন্দ্রীয় ভূমিকা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বহুদিন ধরে সংস্থাটিকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর পরিবর্তে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় আছে। তবে আর্থিক সংকটে জর্জরিত কর্তৃপক্ষ কতটা দায়িত্ব নিতে পারবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এ ছাড়া পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’তে ইসরায়েলি আইন প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্ক চলছে। ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সা’র ইঙ্গিত দিয়েছেন, সেখানে বসতি স্থাপনকারীদের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হতে পারে।

আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী

উভয় পরিকল্পনায়ই আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বাহিনী মিসর-ইসরায়েল সীমান্তে মোতায়েন থাকবে এবং ধাপে ধাপে গাজায় প্রবেশ করবে। এর মাধ্যমে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও হামাসের অস্ত্র সমর্পণ প্রক্রিয়া চালানো হবে। ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে মিসর, জর্ডান ও কিছু ইসলামি দেশে।

সামনে কী?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এত দিন ধরে বলেছেন, কোনও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র তিনি মেনে নেবেন না। কিন্তু যুদ্ধোত্তর গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও কোনও স্পষ্ট রূপরেখা তিনি দেননি। ফলে ট্রাম্পের পরিকল্পনা ও জাতিসংঘের প্রস্তাবের মাঝে কোথায় মিল ঘটবে আর কোথায় ভাঙন আসবে, তা-ই এখন বড় প্রশ্ন।

আশাবাদীরা বলছেন, এটাই হতে পারে দীর্ঘদিনের সংঘাত মেটানোর মোড় ঘোরানো পদক্ষেপ। তবে সংশয়বাদীরা মনে করেন, ট্রাম্পের অতীত অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক কৌশল বিবেচনায় এটি হয়তো কেবল আরেকটি মরীচিকা।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Comments

0 total

Be the first to comment.

যেভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দাফন করছে ইসরায়েল? BanglaTribune | মধ্যপ্রাচ্য

যেভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দাফন করছে ইসরায়েল?

ইসরায়েলি দখলকৃত পশ্চিম তীরে এখন বসবাস করছেন প্রায় ২৭ লাখ ফিলিস্তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এ ভূখণ্ডকে ভবিষ্...

Sep 22, 2025

More from this User

View all posts by admin