‘তুমি ওকে বেশি ভালোবাসো’, ‘তুমি ওকে আগে দিয়েছ’, ‘আমার খেলনাটা কে নিল?’ এ রকম কথোপকথন কি আপনার ঘরেও প্রতিদিন শোনা যায়? ঘরে দু’জন সন্তান থাকলেই কি প্রতিযোগিতা লেগেই থাকে? এটা শুধু আপনার পরিবারের গল্প নয়- বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের অসংখ্য বাবা-মায়ের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। ভাই-বোনের ঝগড়া খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু বারবার, তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠলে তা শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অভিভাবক হিসেবে এই সমস্যার কারণ জানা ও সমাধান জানা অত্যন্ত জরুরি। তার আগে দেখে নেয়া যাক ভাই-বোনদের মধ্যে এমন ঝগড়া হওয়ার কারণগুলো-
মনোযোগের প্রতিযোগিতা
শিশুরা মনে করে, মা-বাবার ভালোবাসা সীমিত। তাই তারা ভাবে- যদি ভাই/বোন বেশি মনোযোগ পায়, তাহলে আমি কম পাব। ছোট সন্তান মায়ের কাছে থাকতে চায়, আর বড় সন্তান ভাবে সে বঞ্চিত হচ্ছে। বাবা-মার একটুখানি পক্ষপাতও তাদের কাছে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। গবেষণা বলছে, যেসব পরিবারে বাবা-মা অজান্তে কোনও এক সন্তানের দিকে বেশি মনোযোগ দেন, সেখানে ভাই-বোন দ্বন্দ্ব বেশি দেখা যায়।
বয়স ও বিকাশগত পার্থক্য
৫ বছরের একটি শিশুর ভাবনা ও ১০ বছরের শিশুর ভাবনা এক নয়। ছোটরা চায় সবকিছু এখনই, বড়রা চায় নিজের মতো সময় ও স্পেস। এই পার্থক্য থেকেই জন্ম নেয় অভিযোগ আর ঝগড়া।
তুলনা ও প্রতিযোগিতা
‘দেখো, ও কেমন ভালো রেজাল্ট করেছে!’ ‘তোমাকেও তোমার ভাইয়ের মত ভাল রেজাল্ট করতে হবে।’ বাবা-মার অজান্তে করা এই তুলনাই অনেক সময় ভাই-বোনের মধ্যে হিংসা বা ক্ষোভ তৈরি করে।
কীভাবে ঝগড়া কমাতে পারেন
দুই সন্তানকেই সমান মনোযোগ দিন, পক্ষপাত যেন না হয়। ছোটদের যত্ন যেমন দরকার, বড়দের সাথেও আলাদা করে সময় দিন। ছোট বাচ্চাকে কোলে নেওয়ার পর বড়টিকেও জড়িয়ে ধরুন বা গল্প বলুন। এতে বড় সন্তান নিজেকে অবহেলিত ভাববে না।
তুলনা নয়, প্রশংসা করুন আলাদাভাবে- ‘তুমি ওর মতো হও’ বলা থেকে বিরত থাকুন। প্রত্যেক সন্তানের বিশেষত্ব তুলে ধরুন। ‘তুমি দারুণ ছবি আঁকতে পারো’ অথবা ‘তুমি চমৎকার করে গল্প বলতে পারো’- এভাবে আলাদা গুণে প্রশংসা করুন।
ঝগড়ার সময় বিচারক না হয়ে ‘গাইড’ হোন। দুই সন্তান ঝগড়া শুরু করলেই ‘কে ঠিক কে ভুল’ না বলে তাদেরকে নিজেরা সমাধান খুঁজতে উৎসাহ দিন। বলুন, ‘তোমরা দু’জনেই বলো, সমস্যা কোথায়?’; ‘তোমরা নিজেরা কীভাবে সমাধান করতে পারো ভাবো?’
এতে তাদের মধ্যে সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি হয়, যা ভবিষ্যৎ জীবনে অনেক উপকারে আসে।
প্রত্যেক সন্তানের জন্য আলাদা সময় রাখুন। একজনের সাথে গল্প বলা, অন্যজনের সাথে হাঁটতে যাওয়া-আলাদা সময় দিন। এতে তারা বুঝবে, বাবা-মা দু’জনের প্রতিই সমান ভালোবাসা রাখেন আর দুজনকেই সমান গুরুত্ব দেন।
আবেগ প্রকাশ শেখান
শিশুকে বলুন, ‘তুমি রাগ করছো, এটা ঠিক আছে। কিন্তু আঘাত করা বা কষ্ট দেওয়া ঠিক না।’ আবেগ প্রকাশের ভাষা শেখালে ঝগড়া অনেক কমে যায়। ভাই-বোনের ঝগড়া কমানো কেন জরুরি
শিশুর বিকাশে ভাই-বোনের সম্পর্ক এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারণ তাদের বিকাশ কেবল তার স্কুল, শিক্ষক বা মা-বাবার ওপর নির্ভর করে না। পরিবারের ভেতরের সম্পর্ক, বিশেষ করে ভাই-বোনের সঙ্গে তার যোগাযোগ, শেখার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। বড় ভাই-বোন যেমন ছোটদের জন্য একটি ‘রোল মডেল’, তেমনি ছোট ভাই-বোন বড়দের শেখায় সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ ও নমনীয়তা।
জ্ঞান বিকাশে ভাই-বোনের ভূমিকা
ভাই-বোনরা একে অপরকে শেখার একটি অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিবেশ দেয়। বড় ভাই বা বোন ছোটদের নতুন শব্দ, গণিত বা পড়াশোনা শেখাতে পারে। আবার ছোটরা বড়দের শেখায় ধৈর্য, পুনরাবৃত্তি ও বোঝানোর দক্ষতা।
গবেষণা অনুযায়ী, যেসব শিশুদের ভাই-বোনের সঙ্গে বেশি কথাবার্তা হয়, তাদের ভাষাগত দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বেশি উন্নত হয়। বড় ভাই/বোন প্রায়ই ছোটদের ‘হোমওয়ার্ক শেখায়’ বা ‘খেলার নিয়ম বুঝিয়ে দেয়’- এই শিক্ষণ-শেখানোর প্রক্রিয়া শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ বাড়ায়।
সামাজিক বিকাশে ভাই-বোনের ভূমিকা
ভাই-বোন হলো শিশুর প্রথম ‘সোশ্যাল গ্রুপ’। এখানে সে ভাগাভাগি, সহযোগিতা, নেতৃত্ব এবং কখনও কখনও মতবিরোধ সামাল দেওয়া শেখে। গবেষণা বলছে, ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা করা শিশুর সহযোগিতামূলক আচরণ ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ায়। ভাই-বোনের মধ্যে ‘একসাথে খেলা’, ‘মেলা বা ঈদে পোশাক ভাগাভাগি করা’- এগুলো সামাজিক বোধ ও টিমওয়ার্ক গঠনে সাহায্য করে। দুই ভাইবোন যখন একসাথে খেলা করে তখন ঝগড়া হয়েই যায়। কিন্তু মা যদি বলেন, ‘তোমরা একসাথে ঠিক করে নাও কে আগে খেলবে’—তখন তারা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান শেখে।
নৈতিক ও আচরণগত বিকাশে ভূমিকা
ভাই-বোন একে অপরের মধ্যে আচরণের আদর্শ তৈরি করে। বড় ভাই বা বোনের আচরণ ছোটরা অনুসরণ করে। বড়রা যখন ঘরের কাজ করে, বয়স্কদের সম্মান করে, তখন ছোটদের মধ্যেও দায়িত্বশীলতা ও শৃঙ্খলা গড়ে ওঠে। একইভাবে, ছোট ভাই/বোন অনেক সময় বড়দের সহনশীল হতে শেখায়, কারণ তাদের জন্য বড়দেরকে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
ভাই-বোনের ঝগড়া কোনও ব্যতিক্রম নয়, বরং এটি শিশুর বেড়ে ওঠার একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সম্পর্কের মাধ্যমে শিশুরা শেখে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সমস্যা সমাধান, সহযোগিতা ও সহানুভূতির মতো আজীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা। তবে ঝগড়া যেন সম্পর্কের বাঁধন ভাঙা বা মানসিক আঘাতে পরিণত না হয়, সেই দায়িত্ব অভিভাবকের।
লেখক: শিশু বিকাশ বিষয়ক গবেষক