ভারতের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি!

ভারতের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি!

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার নতুন ঝড় উঠেছে “চুক্তি বাতিল” বিতর্ককে ঘিরে। হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি, সংবাদ শিরোনাম আর রাজনৈতিক বিশ্লেষণে একটাই প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি সত্যিই ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো বাতিল করেছে?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, পুরো বিতর্কই তৈরি হয়েছে তথ্যের ভ্রান্তি ও যোগাযোগের বিভ্রান্তি থেকে।বিতর্কের সূচনা যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীবের একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়ে। তিনি দাবি করেন, গত এক দশকে ভারতের সঙ্গে করা অন্তত দশটি বড় চুক্তি বাতিল করা হয়েছে, বাকিগুলোও পর্যালোচনাধীন। পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। অনেকেই ধরে নেন, বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করেছে। কিন্তু পরদিনই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বিষয়টি পরিষ্কার করেন। তিনি জানান—যেসব চুক্তি বাতিলের কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে অনেকগুলোর অস্তিত্ব নেই, কিছু আছে সমঝোতা স্মারক, কিছু আলোচনাধীন প্রস্তাব, আর মাত্র একটি প্রতিরক্ষা প্রকল্প— আর্থিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হওয়ায় বাতিল করা হয়েছে।তার বক্তব্যের পর বোঝা গেলো, আসল সমস্যা চুক্তি নয়, বরং তথ্যের অভাব ও যোগাযোগের অদক্ষতা। রাষ্ট্রের নীতি-সংক্রান্ত তথ্য যখন যাচাই-বাছাই ছাড়াই সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তখন ভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, বিভ্রান্তি ছড়ায় আর সরকার নিজেই নিজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থায় পড়ে। একটি দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কোনও ফেসবুক পোস্ট বা ব্যক্তিগত মন্তব্যে নির্ধারিত হতে পারে না। কারণ, চুক্তি মানে শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়—এতে জড়িয়ে থাকে কূটনৈতিক ভারসাম্য, বিনিয়োগ ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক আইন এবং পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন।বাংলাদেশের জনগণ আশা করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকার অতীতের অসম চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করবে এবং ভারতের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলবে। কিন্তু সেই কাজ হতে হবে পরিকল্পিতভাবে, তথ্যভিত্তিক যুক্তিতে এবং প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা মেনে। সামাজিক মাধ্যমে আবেগী ঘোষণার মাধ্যমে নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে পরিণত, সংগঠিত ও দায়িত্বশীল—কারণ এখানে ব্যক্তিগত প্রচারের নয়, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত।এদিকে, এই প্রশ্নগুলো এখন আদালতের দোরগোড়াতেও পৌঁছেছে। ২৩ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আজিজুল হক হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেছেন—যেখানে ভারতকে দেওয়া ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধাসহ সব চুক্তির তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। রিটে আরও বলা হয়েছে, যেসব চুক্তি বাংলাদেশের জন্য বৈষম্যমূলক বা একতরফা, সেগুলো বাতিলের পদক্ষেপ নিতে হবে।এটি প্রমাণ করে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়—একটি নীতিগত ও জন-অধিকারভিত্তিক আলোচনায় রূপ নিয়েছে।ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জটিল ও বাস্তবনির্ভর। সীমান্ত, পানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তাই কোনও চুক্তি বাতিলের ঘোষণা মানে কেবল একটি কাগজে দাগ টানা নয়; এটি একটি বার্তা—যা প্রভাব ফেলে দুই দেশের আস্থা, বাণিজ্য এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ওপর। সেই বার্তা যদি ভুলভাবে যায়, ক্ষতি হয় দুই পক্ষেরই, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার।এ ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি বড় সত্য প্রকাশ পেয়েছে—সরকারের ভেতরে এখনও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এক দফতর জানে না অন্য দফতর কী বলছে। এক উপদেষ্টা ঘোষণা দেন, অন্য উপদেষ্টা তা অস্বীকার করেন। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিপজ্জনক লক্ষণ। সরকারের উচিত, পররাষ্ট্র বা বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে নির্দিষ্ট মুখপাত্রের মাধ্যমে তথ্য প্রকাশ করা, যাতে জনগণ বিভ্রান্ত না হয় এবং রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট থাকে।

জনগণের জানার অধিকার আছে—ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রকৃত চুক্তিগুলো কী, কতগুলো বাস্তবায়িত, কতগুলো আলোচনাধীন, আর কতগুলো সত্যিই বাতিল। গোপনীয়তা নয়, স্বচ্ছতাই সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি রক্ষার প্রথম শর্ত হলো সঠিক তথ্যের প্রচার এবং দায়িত্বশীল যোগাযোগ।রাষ্ট্র পরিচালনা কোনও ফেসবুক পোস্টের বিষয় নয়। এটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ, জাতির মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের বিষয়।একটি ভুল মন্তব্য, একটি আবেগী পোস্ট বা অপরিপক্ব ঘোষণা কখনও কখনও পুরো রাষ্ট্রকেই বিব্রত পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।তাই এখন সময় এসেছে, সরকার ও সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের বুঝতে হবে—পরিণত আচরণই রাষ্ট্রের পরিণত রাজনীতির ভিত্তি। কারণ শেষ পর্যন্ত—রাষ্ট্র কোনও সোশ্যাল মিডিয়া নয়, এটি আস্থার প্রতিষ্ঠান।লেখক: কথাসাহিত্যিক

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin