টানা কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গজুড়ে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। পাহাড়ে ভূমিধস, নদী উপচে প্লাবন, গ্রামীণ রাস্তা ভেঙে পড়া এবং সড়ক–রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উত্তরবঙ্গ কার্যত কলকাতা থেকে আলাদা হয়ে গেছে। বহু জেলা এখন বিদ্যুৎবিহীন, খাদ্য ও জ্বালানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৮ জনের।
দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার ও কালিম্পং—এই পাঁচ জেলায় বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মহানন্দা, তিস্তা, তোর্সা, জয়ন্তী ও রায়ডাক নদীর জল বিপদসীমার অনেক উপরে। নদীর বাঁধ ভেঙে কয়েক ডজন গ্রাম সম্পূর্ণ প্লাবিত। এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে উত্তরবঙ্গে ২৮ জনের মৃত্যু ও ৪৩ জন আহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২৫ জন। বহু মানুষ গাছের উপর বা উঁচু ভবনে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন।
শিলিগুড়ি–নিউ জলপাইগুড়ি–কোচবিহার রেললাইন একাধিক জায়গায় জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এনএইচ–৩১ ও এনএইচ–৩১সি-র বিভিন্ন অংশ ধসে পড়ায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ। ফলে উত্তরবঙ্গে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ সরবরাহে প্রবল সমস্যা দেখা দিয়েছে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68e2b6c3ecd94" ) );
টানা বৃষ্টিতে নদীর স্রোত ও জলাধারের জল ছাড়ায় উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কলকাতার সব ধরনের যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। রেলপথে অধিকাংশ দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল। জাতীয় সড়ক পানিতে ডুবে গেছে, ট্রাক ও বাস আটকে আছে পথে পথে। বাগডোগরা বিমানবন্দরে একাধিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।ফলে উত্তরবঙ্গ এখন প্রায় “দ্বীপ”-এর মতো বিচ্ছিন্ন। কলকাতা থেকে প্রশাসনিক সাহায্য ও ত্রাণ পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে। বিপর্যস্ত এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজ্য ও কেন্দ্র উভয়ই সক্রিয়।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরুদ্ধারই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। প্রশাসন দিনরাত কাজ করছে। সেনাবাহিনীর পাঁচটি টিম, এনডিআরএফ-এর আটটি ইউনিট ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ইতোমধ্যে নামানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে, এবং ৭০টিরও বেশি অস্থায়ী ত্রাণ শিবির গড়ে তোলা হয়েছে। রাজ্য সরকারের ত্রাণ দফতর জানিয়েছে, উত্তরবঙ্গে এখন পর্যন্ত ৪৫ টন শুকনো খাবার, ১ লাখ বোতল বিশুদ্ধ জল ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বন দফতর বিশেষ দল পাঠিয়েছে ডুয়ার্স এলাকায়, যেখানে বহু হাতি, হরিণ ও গন্ডার প্লাবনে বিপন্ন অবস্থায়।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68e2b6c3ecdc9" ) );
লাগাতার বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলা। শনিবার রাতে প্রবল জলস্রোতে মাদারিহাটের জলদাপাড়া টুরিস্ট লজের সামনে হলং নদীর কাঠের সেতু ভেঙে পড়ে, ফলে আটকে পড়েছেন একাধিক পর্যটক। কারণ, জলদাপাড়ার কিছু এলাকা বাকি ডুয়ার্সের বাকি অংশের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জলদাপাড়া ট্যুরিস্ট লজে যাওয়ার একমাত্র পথ হলো এই সেতু। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টির জেরে নদীর জলস্তর বাড়তে থাকে। প্রবল স্রোতের চাপে রবিবার সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ ভেঙে যায় কাঠের সেতুটি, যা দিয়ে প্রতিদিন পর্যটকরা টুরিস্ট লজ থেকে জঙ্গল সাফারিতে যেতেন। সেতু ভাঙার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন পর্যটক ও বনকর্মী। তাদের মধ্যে কেউ আহত হননি, তবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। পর্যটকরা বর্তমানে টুরিস্ট লজেই আশ্রয় নিয়েছেন। বন দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, পানির স্তর কিছুটা কমলেই উদ্ধারকাজ শুরু হবে এবং বিকল্প পথে পর্যটকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, প্রবল বৃষ্টিতে বর্তমানে জলদাপাড়ার অধিকাংশ এলাকা জলমগ্ন। তিস্তা, তোর্সা, ও হলং নদী উপচে পড়ছে। ইতোমধ্যে জল ঢুকে পড়েছে সংলগ্ন বনাঞ্চলে, যার ফলে বিপদের মুখে পড়েছে বন্যপ্রাণও। জেলাশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, ডিএফও পরিস্থিতির উপরে নজর রাখছেন। প্রশাসনের তরফে সতর্কতা জারি করে বলা হয়েছে, নদী ও সেতুর আশেপাশে পর্যটক ও স্থানীয়দের না যেতে। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টা উত্তরবঙ্গে আরও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা।