ভ্যাকসিন উৎপাদন: বাংলাদেশের সুযোগ, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভ্যাকসিন উৎপাদন: বাংলাদেশের সুযোগ, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ভ্যাকসিন বা টিকা একটি অপরিহার্য উপাদান। শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক, সব বয়সের মানুষের জীবন রক্ষায় ভ্যাকসিনের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর ভ্যাকসিন ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন মানুষের জীবন রক্ষা করে। আমাদের দেশেও গত কয়েক দশকে শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, এমনকি সাম্প্রতিক কোভিড মহামারি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রতিবছর শিশুমৃত্যু কমেছে প্রায় ৯৪ হাজার এবং ৫০ লাখ শিশুকে রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। বাংলাদেশে ইপিআই কর্মসূচির শুরুটা হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। তিনি ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল WHO ও UNICEF-এর সহযোগিতায় আনুষ্ঠানিকভাবে ইপিআই চালু করেন। সে সময় ইপিআই কর্মসূচিতে ৬টি টিকা (BCG, DPT, OPV, Measles, TT, DT) অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখেন। ১৯৯০-এর দশকে তাঁর সরকারের সময় টিকাদান কাভারেজ বাড়ানো হয় এবং জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ টিকাদান সপ্তাহ চালু করা হয়, যা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। UNICEF, WHO এবং Gavi-এর তথ্যমতে বর্তমানে আমাদের দেশের ৭৯ শতাংশ  শিশুকে পুরোপুরি ইপিআই’র কাভারেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।বাংলাদেশের ভ্যাকসিন বাজার ও উৎপাদন সক্ষমতাবাংলাদেশের ভ্যাকসিন বাজার মূলত ইপিআই এবং বেসরকারি খাতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। দেশে বর্তমানে ব্যবহৃত ভ্যাকসিনগুলোর বেশিরভাগই আমদানিকৃত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত ইপিআই প্রতি বছর চার মিলিয়ন শিশুকে টিকা দেয়, যার বেশিরভাগই UNICEF ও Gavi-এর সহায়তায় সংগ্রহ করা হয়। দেশীয় পর্যায়ে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হেপাটাইটিস বি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, র‌্যাবিসসহ কয়েকটি ভ্যাকসিন সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। তবে তাদের উৎপাদনের পরিমাণ এখনও সীমিত। ভ্যাকসিন উৎপাদনের ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭০-এর দশকে ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ (IPH) কিছু ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু করেছিল। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে বিসিজি (BCG) ভ্যাকসিন তৈরি শুরু করে এবং পরবর্তীতে সীমিত আকারে ডিপিটি (DPT-Diphtheria, Pertussis, Tetanus) ও টিট (Tetanus Toxoid) ভ্যাকসিন তৈরি করেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে দেশীয় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে, আর বর্তমানে আমরা মূলত আমদানি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দাতা সংস্থা কিংবা বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। আমাদের দেশের ভ্যাকসিন কর্মসূচিতে গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স বা Gavi দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম সহযোগী।

বর্তমানে প্রতিবছর ভ্যাকসিন ক্রয়, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং টিকাদান-সংক্রান্ত অন্যান্য খাতে প্রায় ২৩০–২৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। এই ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি অর্থায়ন করে থাকে Gavi। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি, তারা প্রযুক্তিগত দিকনির্দেশনা, ভ্যাকসিন সাপ্লাই চেইন উন্নয়ন, ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা তৈরি, এবং ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েট করবে ফলে তাই নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৯ সালের পর থেকে Gavi-এর আর্থিক সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ দ্রুত বর্ধনশীল একটি অর্থনীতি, যেখানে স্বাস্থ্য খাতে ভ্যাকসিনের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ শিশুর জন্ম হওয়ায় শুধু জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমেই আমাদের রয়েছে বিশাল বাজার।

অপরদিকে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থাগুলো অনুমান করছে, ২০২৯ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ভ্যাকসিন ক্রয় এবং এ সম্পর্কিত খাতে ব্যয় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। টাকার হিসেবে যা সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। ভ্যাকসিন আমদানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে শুধু ক্রয় ব্যয়ই নয়, পরিবহন, কোল্ডচেইন রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরবরাহ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হবে। ফলে সামগ্রিকভাবে ভ্যাকসিন সংক্রান্ত খরচ প্রতিবছর দ্রুত বাড়বে।

এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ, যেহেতু এত বিপুল পরিমাণ অর্থ এককভাবে জাতীয় বাজেট থেকে বরাদ্দ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এছাড়া সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারি প্রমাণ করেছে যে স্থানীয়ভাবে ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতা না থাকলে একটি দেশের জন্য বৈশ্বিক সংকটে নিজস্ব জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এখনই বিকল্প উদ্যোগ—বিশেষ করে দেশীয় উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে টেকসই সমাধান—গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।সম্ভাবনা ও শক্তিআমাদের রয়েছে বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার। প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ শিশুর জন্ম হওয়ায় জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমেই ভ্যাকসিনের স্থায়ী চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য HPV, শিঙ্গলস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের বাজারও ক্রমবর্ধমান। এছাড়া বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি ইতোমধ্যে বিশ্বে স্বীকৃত। দেশে ২৭৩টি কোম্পানি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, যারা সম্মিলিতভাবে দেশীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশের বেশি ওষুধ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৩.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমাদের এই শক্তিশালী ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারলে ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা যাবে। তার জন্য প্রয়োজন সরকারের নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি ভ্যাকসিন উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেয়া।

আমাদের আরেকটি শক্তিশালী দিক হলো বিপুল সংখ্যক তরুণ শিক্ষিত জনবল। যাদের আন্তর্জাতিক মানের ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে ভ্যাকসিন উৎপাদন ও গবেষণায় দক্ষ করে তোলা সম্ভব। আর, যদি স্থানীয় ভ্যাকসিন শিল্প গড়ে উঠানো যায় তবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এই কাজগুলোর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ শুরু করা। এটা হতে পারে প্রযুক্তি স্থানান্তর (Technology Transfer) এবং যৌথ উৎপাদনের (Co-production) মাধ্যমে।  এই কাজগুলো যদি পরিকল্পনামাফিক করা যায় তবে ভবিষ্যতে আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক ভ্যাকসিন সাপ্লাই চেইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি।মূল চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতাআমাদের এই খাতে যেমন অনেক সম্ভাবনা রয়েছে তেমনি রয়েছে বেশকিছু সীমাবদ্ধতা। শুরুতেই বলা যায় বাংলাদেশে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-এর সক্ষমতার কথা। আমাদের সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি এখনো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ভ্যাকসিন অনুমোদন ও রেগুলেটরি তদারকি করার মতো শক্তিশালী নয়। তারপরে আসে রিসার্চ এবং ডেভেলপমেন্টের দুর্বলতার কথা। ভ্যাকসিন একটি উচ্চ প্রযুক্তি ও গবেষণানির্ভর খাত। আমাদের প্রাথমিক গবেষণা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অবকাঠামো এবং ল্যাবরেটরি সাপোর্ট  এখনও অপর্যাপ্ত। ফলে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার একটি উপায় হলো প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে কাজ করা। সমস্যা হলো বৈশ্বিক ভ্যাকসিন কোম্পানিগুলো সাধারণত মেধাস্বত্ব ও প্রযুক্তি শেয়ার করতে আগ্রহী হয় না। তাছাড়া আমাদের  রয়েছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। ভ্যাকসিন উৎপাদন ও গবেষণার জন্য মলিকুলার বায়োলজি, বায়োপ্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং, ইমিউনোলজি প্রভৃতি বিষয়ে বিশেষায়িত জনবল প্রয়োজন। আমাদের দেশে অত্যাধুনিক GMP (Good Manufacturing Practice) মানসম্পন্ন উৎপাদন প্ল্যান্ট ও BSL-3 ল্যাব এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে প্রযুক্তি স্থানান্তর করলেও যৌথ উৎপাদনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। আবার বাংলাদেশে এখনও বায়োটেকনোলজি ও ভ্যাকসিন সংক্রান্ত পেটেন্ট ও আইপি সুরক্ষা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, ফলে ভ্যাকসিন শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের ভ্যাকসিন শিল্প দ্রুত এগোতে পারলেও এই কাঠামোগত ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতাগুলো সমাধান না করলে শিল্পের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ  বাংলাদেশের ভ্যাকসিন শিল্প বিকাশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা প্রয়োজন। আমাদের প্রথমে তৈরি করতে হবে কিছু স্বল্পমেয়াদি (১-৫ বছর) কর্ম-পরিকল্পনা। এর আওতায় বেশকিছু প্রাথমিক কাজ করা যায়। যেমন- জাতীয় ভ্যাকসিন নীতি প্রণয়ন ও DGDA-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি, টেকনোলজি ট্রান্সফারের উদ্যোগ। এই কাজগুলোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাকসিন প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিশেষায়িত কোর্স চালু।

স্বল্পমেয়াদি কাজগুলো বাস্তবায়নের পর মনোযোগ দিতে হবে কিছু মধ্যমেয়াদি (৫-১০ বছর) পরিকল্পনায়। এই সময়ে দেশে ভ্যাকসিন গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য জাতীয় ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি লক্ষ রাখতে হবে যেন অন্তত ৩-৫টি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভ্যাকসিন WHO-prequalification অর্জন করে। আর, দীর্ঘমেয়াদের (১০–১৫ বছর) পরিকল্পনায় আমাদের লক্ষ্য হবে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ভ্যাকসিন উৎপাদন হাব হিসেবে গড়ে তোলা। এ সময়ের ভিতর আমাদের উৎপাদিত ভ্যাকসিন আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি শুরু করতে হবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো আমাদের জন্য চমৎকার বাজার হতে পারে।সব মিলিয়ে, সঠিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী নীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকলে বাংলাদেশ আগামী দশকের মধ্যে একটি বৈশ্বিক মানসম্পন্ন ভ্যাকসিন উৎপাদক দেশে পরিণত হতে পারে।লেখক: পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চার, ভাইরাল ভ্যাক্সিন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ন্যাশনাল হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, তাইওয়ান।[email protected]

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin