বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে গুণগত মান নিশ্চিত করা কেবল শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের প্রত্যাশা পূরণের বিষয় নয়; এটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। একটি জাতি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাধ্যমে গঠিত হয়, আর এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো মূল স্তম্ভ। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিচালনা, পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন, শিক্ষক সমাজের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকা অপরিহার্য। এ আলোকে বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন না; তারা শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজের জন্য দিকনির্দেশনা স্থাপন এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মূল নীতিমালা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।দুঃখজনকভাবে, দীর্ঘদিন ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, অনিয়ম এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ বহুলভাবে শোনা যায়। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, এন্ট্রি লেভেলের সহকারী শিক্ষক বা প্রভাষক পদে নিয়োগ কেন্দ্রীয়ভাবে এনটিআরসিএ (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) পরিচালনা করে। তবে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের মতো প্রশাসনিক পদগুলোর নিয়োগ এখনও মূলত প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে। তাত্ত্বিকভাবে সরকারি প্রতিনিধি থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক লেনদেন, আত্মীয়প্রীতি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রায়ই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে। এর ফলে প্রকৃত যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, আর তুলনামূলক অযোগ্য বা সীমিত দক্ষ প্রার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে যান। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষার মানে, শিক্ষক সমাজের পেশাগত নৈতিকতা এবং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতে।সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে নানাভাবে দাবি জানিয়েছেন যে প্রশাসনিক এ পদগুলোর নিয়োগও এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে হওয়া উচিত। তাদের অভিমত, পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ প্রায়ই রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম এবং অর্থের বিনিময়ে সম্পন্ন হয়। একাধিক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষক রাজনৈতিক আনুগত্য না থাকার কারণে সুযোগ পাননি। আবার অনেক সময় অযোগ্য বা সীমিত দক্ষতার ব্যক্তিকে প্রভাব খাটিয়ে পদে বসানো হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়, শিক্ষক সমাজ বিভক্ত হয় এবং শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।এই অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষসহ অন্যান্য প্রশাসনিক পদগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়া এনটিআরসিএ‘র হাতে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা বিদ্যমান বিধি-বিধান পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেবে যে এই পদগুলো এনটিআরসিএ‘র মাধ্যমে নিয়োগযোগ্য কিনা। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ মনে করছেন, এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং স্বজনপ্রীতির অবসান ঘটবে এবং প্রার্থীদের মধ্যে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে পদ বণ্টন নিশ্চিত হবে।এনটিআরসিএ ইতোমধ্যে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একটি স্বচ্ছ, কেন্দ্রীভূত ও যোগ্যতাভিত্তিক কাঠামো তৈরি করেছে। এই কাঠামোর অধীনে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা জাতীয় মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়িত হন; তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষণদক্ষতা, নেতৃত্বগুণ এবং নৈতিকতা যাচাই করা হয়। তাই যদি প্রশাসনিক পদগুলোর নিয়োগও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়, তবে নিশ্চিত করা যাবে যে শুধু যোগ্য, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই নেতৃত্বে আসছেন। এতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের সুযোগ থাকবে না।স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি শিক্ষার্থীর জন্য ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করে, অভিভাবকের আস্থা বৃদ্ধি করে এবং শিক্ষক সমাজের পেশাগত মানোন্নয়নেও সহায়ক হয়। যখন শিক্ষকরা জানবেন যে পদোন্নতি, সম্মান বা নেতৃত্বের সুযোগ শুধু যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, তখন তারা নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে আরও মনোযোগী হবেন। এর ফলে সুস্থ ও গঠনমূলক প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়নে সহায়ক।তবে এই পরিবর্তন বাস্তবায়ন মোটেও সহজ নয়। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং সামাজিক সচেতনতা অপরিহার্য। এনটিআরসিএকেও তাদের স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহি অটুট রাখতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ন্যায্যতা এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, অভিভাবক, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং সমাজকর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা থাকতে হবে—যাতে এই উদ্যোগ শিক্ষাক্ষেত্রে সত্যিকারের ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনে।বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শিক্ষা খাতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় ঘাটতি, পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা—এসবের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নেতৃত্বের ঘাটতি। একটি প্রতিষ্ঠান সঠিক নেতৃত্ব না পেলে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো নেতৃত্বে স্বচ্ছতা আনা এবং শুধু যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের নিয়োগ নিশ্চিত করা।সব মিলিয়ে বলা যায়, বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষের নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক পদ পূরণের বিষয় নয়; এটি সরাসরি জাতীয় শিক্ষার মান, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকনির্দেশ এবং দেশের অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে এই নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক উদ্যোগ—এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে নিয়োগ—একটি সময়োপযোগী ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ। এটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীর সুষ্ঠু বিকাশ, শিক্ষক সমাজের পেশাগত নৈতিকতা এবং অভিভাবকের আস্থা পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।শিক্ষাক্ষেত্রে এই পদক্ষেপের সাফল্য নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছা, সমাজের সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণের ওপর। দীর্ঘমেয়াদে, যোগ্য নেতৃত্ব, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। তাই এখনই সময়, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগের প্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার, যা বাংলাদেশে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সক্ষম ও নৈতিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি স্থাপন করবে।লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।