বিএনপি: সংকট, সংশয় ও সম্ভাবনা

বিএনপি: সংকট, সংশয় ও সম্ভাবনা

দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি আবারও এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে, যখন জাতীয় নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। কখনো ‘কঠোর’ আন্দোলনের ডাক, কখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইঙ্গিত, আবার কখনো বিদেশি সমর্থনের প্রত্যাশা—এই তিনটি কৌশলকে ঘিরেই তাদের রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে। এর ফলে নেতাদের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠছে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে।এই প্রেক্ষাপটে আবৃত্তিকার ও সংস্কৃতিকর্মী রাকিব হাসানের একটি ফেসবুক পোস্ট বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি লিখেছেন, "যদি ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪ সালের নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতো, বিএনপি সহজেই বিপুল ব্যবধানে জয় পেতো। মানুষ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত ছিল, কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বের দ্বিধা ও দূরদৃষ্টির অভাবে সেই সম্ভাবনা বাস্তব রূপ নেয়নি। ফলে ইতিহাসের একাধিক মোড়ে দলটি নিজেকে আড়ালে সরিয়ে ফেলেছে।তাঁর এই অনুশোচনা নিছক আবেগ নয়, বরং বাস্তবতার নির্মম প্রতিফলন।রাকিব লিখেছেন "যখনই আন্দোলনের আহ্বানে মানুষ রাস্তায় নেমেছে, বিএনপি নেতৃত্বের দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান সেই স্বতঃস্ফূর্ত শক্তিকে কাজে লাগাতে পারেনি। ২০১৩-১৪ সালের আন্দোলন থেকে ২০১৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিবারই জনসমর্থনের ঝলক দেখা গেছে, কিন্তু সঠিক কৌশল ও ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বের অভাবে তা ধারাবাহিকতা পায়নি।"হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের প্রতি জনসমর্থন শক্তিশালী ছিল, কিন্তু কার্যকর কর্মসূচি ও শক্তিশালী সংগঠন না থাকায় আওয়ামী লীগের একতরফা কৌশল সফল হয়।বিএনপির সবচেয়ে বড় সংকট নেতৃত্বের প্রশ্নে। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও নিষ্ক্রিয়তা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাস জীবন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব দলকে দুর্বল করে ফেলেছে। এর ফলে বিএনপি জনগণের কাছে শক্তিশালী বিকল্প সরকার হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি।আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো—বিএনপির জনগণের আবেগকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে না পারা। বাংলাদেশের সমাজে ইসলাম ও সংস্কৃতির সমন্বয় একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা, কিন্তু বিএনপি এ বিষয়ে কখনোই সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে পারেনি।আন্তর্জাতিক মাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিএনপি সব সময় দ্বৈতচরিত্র বজায় রাখার চেষ্টা করেছে—আন্তর্জাতিক মহলে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা, আবার দেশীয় সমর্থকদের কাছে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল দেখানো। এই দ্বৈততা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে।এখানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রাসঙ্গিক। তিনি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস, বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং স্বাধীনতার চেতনার সমন্বয়ে একটি নতুন জাতীয় পরিচয় সৃষ্টি করেছিলেন। এটি ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের সমন্বিত রূপ। এই দর্শনের ভিত্তিতেই বিএনপি দ্রুত একটি জাতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।এই জাতীয়তাবাদ আজও প্রাসঙ্গিক। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ৮৬ শতাংশ বাংলাদেশি মনে করেন ইসলাম তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষণায় দেখা যায়, তরুণ প্রজন্ম আধুনিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়। অর্থাৎ জনগণ এমন এক জাতীয়তাবাদ চায়, যা ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করে, আবার আধুনিক উন্নয়নের স্বপ্নও প্রতিফলিত করে।বর্তমান বিএনপি এই দর্শন থেকে সরে যাচ্ছে। অনেক নেতা আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়ার আশায় অতিমাত্রায় ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি তুলে ধরছেন, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিভাজন জনআস্থা নষ্ট করছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রযুক্তি নিয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার অভাব তরুণদের হতাশ করছে। ফলে নতুন প্রজন্মের একটি অংশ বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকছে।তবু বিএনপির সামনে সুযোগ আছে। জনগণের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে শ্রদ্ধা করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়া এবং সৎ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠন করা সম্ভব। মানুষ এখনো পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে। প্রশ্ন হলো—বিএনপি কি সেই জনস্পন্দন ধরতে পারবে?রাকিব হাসানের সংক্ষিপ্ত পোস্টটি আসলে গভীর এক সত্য উন্মোচন করেছে—বিএনপি জনগণের পালস ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ জনগণ প্রস্তুত ছিল, এখনও আছে। শহীদ জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদই এখনও এই জাতির কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক দর্শন। বিএনপি যদি সেই দর্শনে ফিরে গিয়ে আধুনিক ও সময়োপযোগী কর্মসূচি তৈরি করতে পারে, তাহলে সম্ভাবনার দ্বার এখনও খোলা। অন্যথায় তারা ইতিহাসে সহানুভূতির দল হিসেবেই রয়ে যাবে।বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখন তাকিয়ে আছে—বিএনপি কোন পথে যাবে?লেখক: কলামিস্ট, আজীবন সদস্য—বাংলা একাডেমি।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin