চায়ের দোকান থেকে ডেকে নিয়ে ব্যবসায়ীকে ‘মাদক মামলা’

চায়ের দোকান থেকে ডেকে নিয়ে ব্যবসায়ীকে ‘মাদক মামলা’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকাটি বহুদিন ধরেই মাদক কারবার, সংঘর্ষ ও সহিংসতার জন্য কুখ্যাত। সেখানে আবারও উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ। বাসিন্দাদের দাবি, নিরপরাধ এক মাংস ব্যবসায়ীকে চায়ের দোকান থেকে ডেকে নিয়ে মাদক মামলায় ফাঁসিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কৃষি মার্কেট সংলগ্ন সড়কের পাশে এক চায়ের দোকানে বসেছিলেন স্থানীয় মাংস ব্যবসায়ী মো. ইস্তেখার। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে পরিবার জানায়, এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য সেখানে এসে বলেন, কথা আছে, চলুন আমাদের সঙ্গে। এরপর তাকে পাশের একটি জায়গায় নিয়ে আটকে রাখা হয়। পরে রাতে মোহাম্মদপুর থানায় নিয়ে যায়।

পরদিন শুক্রবার সকালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠায় মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।

‘নির্দোষ মানুষকে হয়রানি করছে পুলিশ’

ইস্তেখারের স্ত্রী আয়েশা আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার স্বামী একজন মাংস ব্যবসায়ী। কোনও অপরাধের সঙ্গে জড়িত না। চায়ের দোকান থেকে কথা আছে বলে ডেকে নিয়ে পুলিশ মাদক মামলা দিয়েছে। তিন সন্তান আর বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে আমি এখন দিশেহারা।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাতভর থানার সামনে অপেক্ষা করেছি। তিনটি শিশু সন্তান, বৃদ্ধা মা সবাইকে নিয়ে পুলিশ সদস্যদের পায়ে ধরেছি। কিন্তু কেউ আমাদের কথা শোনেনি।’

পরিবারের দাবি, ইস্তেখার জেনেভা ক্যাম্পের স্থায়ী বাসিন্দা এবং এলাকায় মাদকবিরোধী অবস্থানের কারণে মাদকচক্রের টার্গেটে ছিলেন। তিনি এর আগে একাধিকবার মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি সাংবাদিক ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে মাদককারবিরের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।

‘যিনি মাদকবিরোধী, তাকেই ফাঁসানো হয়েছে’

জেনেভা ক্যাম্পের বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা আব্বাস হোসেন বলেন, ‘ইস্তেখার সবসময় মাদকবিরোধী আন্দোলনে ছিলেন। মাদক ব্যবসায়ীরা তাকে শত্রু মনে করে আগে থেকেই ফাঁসানোর চেষ্টা করছিল। পুলিশের কিছু সোর্স টাকা নিয়ে এই কাজ করেছে।’

সরেজমিনে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাম্পে পুলিশের সোর্স পরিচয়ে একাধিক ব্যক্তি মাদক বিক্রি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয়দের দাবি, ‘আসল মাদক ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও, পুলিশ সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসায়।’

জেনেভা ক্যাম্পে রমরমা মাদক ব্যবসা

মোহাম্মদপুরের গজনবী রোড, বাবর রোড, শাহজাহান রোড ও হুমায়ুন রোডঘেরা এলাকা নিয়ে গঠিত অবাঙালি ক্যাম্প; যা জেনেভা ক্যাম্প নামে পরিচিত। এলাকাবাসীর ভাষ্যে, পুলিশের নিয়মিত টহল ও চেকপোস্ট থাকা সত্ত্বেও ক্যাম্পে চলছে রমরমা মাদক ব্যবসা।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তত ১১ জন শীর্ষ মাদক কারবারী ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণে। তাদের প্রত্যেকের রয়েছে ২০ থেকে ৫০ জনের অস্ত্রধারী অনুসারী। পুলিশি সূত্রে জানা গেছে, ‘প্রতিদিন কোটি টাকার মাদক লেনদেন হয় এই এলাকাতেই।’

একের পর এক সংঘর্ষ, হতাহতের ঘটনা

ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষে জড়ায় প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো। ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩০ বারের বেশি সংঘর্ষ ঘটেছে; যেখানে ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিবিনিময়ে গত এক বছরে অন্তত ৯ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

সর্বশেষ বুধবার (২৩ অক্টোবর) দিবাগত রাতে ককটেল বিস্ফোরণে জাহিদ হোসেন (২২) নামে এক তরুণ নিহত হন। তিনি কল্যাণপুরে একটি মোবাইল সার্ভিসিং দোকানে কাজ করতেন। নিহতের বন্ধু আফতাব হোসেন বলেন, ‘বুধবার গভীর রাতে সংঘর্ষ হচ্ছিল, তখন বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ককটেল এসে জাহিদের গায়ে পড়ে বিস্ফোরিত হয়।’

পুলিশের বিরুদ্ধে সোর্সদের মাদক বাণিজ্যের অভিযোগ

ক্যাম্পের একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, ফকিন্নি কাল্লু, মোল্লা মেহতাব ও মোল্লা বশিরসহ কয়েকজন পুলিশের সোর্স পরিচয়ে মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাদের আশ্রয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করছে বলে অভিযোগ।

অবাঙালিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা এক সংগঠনের নেতা বলেন, মোহাম্মদপুরের ছয়টি অবাঙালি ক্যাম্পে একই চক্র মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে। কিছু পুলিশ সদস্যের ছত্রছায়ায় এই ব্যবসা চলছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পে মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চলছে। ইতোমধ্যে একাধিক চক্র ধরা পড়েছে। আমরা চেষ্টা করছি যাতে করে কোনও নিরপরাধ মানুষ হেনস্তা শিকার না হয়।’

ওসি কাজী মো. রফিক আহমেদ বলেন, ‘এখানে পক্ষ-বিপক্ষ রয়েছে। একপক্ষ অন্য পক্ষকে ধরিয়ে দিতে সাহায্য করে। যাচাই-বাছাই করতে গেলে অনেক সময় লাগে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে মাদক, হত্যা ও সহিংসতা চলছে। বারবার অভিযান হলেও নিয়ন্ত্রণ আসছে না– এই ব্যর্থতার দায় পুলিশেরই।

জেনেভা ক্যাম্পে মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি এবং প্রকৃত অপরাধীদের ছাড় দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে– মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আড়ালে কি পুলিশের কিছু সদস্য নিজেই সেই চক্রের অংশ হয়ে উঠছে? ফলে বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিশেষ নজরদারি দাবি জানান ক্যাম্পের বাসিন্দারা।

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin