যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএইড’র সহায়তায় বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন এনজিও’র ১০০টির বেশি প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে ২০২৫ সালে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে এনজিও’র কাজের মডেল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। একইসঙ্গে কাজের কয়েকটি অধিক্ষেত্রও চিহ্নিত করেছেন তিনি। তবে এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের সঙ্গে এনজিওদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
শনিবার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরশনের হলরুমে ‘গণসাক্ষরতা অভিযান’ আয়োজিত ‘বৈশ্বিক ও অন্যান্য কারণে সৃষ্ট অর্থায়ন সংকটের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর বর্তমান অবস্থা ও করণীয়’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘এমন কোনও সেবামূলক কাজ নেই যেখানে এনজিওদের সেবা বিস্তৃত হয়নি। বাংলাদেশে এনজিও’র যে বড় ভূমিকা তেমনটি পৃথিবীর আর কোনও দেশে দেখা যায়নি। তবে ফান্ডিংয়ের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশে নতুন করে সমস্যা তৈরি হবে। বিদেশি সহায়তা কমে যাবে।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকারের মাধ্যমেও এনজিওগুওলা কিছু কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। প্রকল্প একটা সময়সীমার মধ্যে থাকে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সময় বাড়ানো হয়।’
এনজিওদের সমস্যা মোকাবিলার সুপারিশ তুলে ধরে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘এনজিওদের কাজের মডেলগুলো চেঞ্জ করতে হবে। স্থানীয় কমিউনিটি বেজড অনেক সম্পদ রয়েছে। যেমন; নদীতে চর জেগে ওঠা, সেখানে ফসল চাষ করা যেতে পারে। জলাভূমি আছে, যেখানে মাছ চাষ হতে পারে; এছাড়া বনভূমি আছে। এগুলোকে সারা পৃথিবীতে কমনস বলা হয়। কমনস ভূমিতে দরিদ্র মানুষের অধিকার থাকা উচিত। এটাও একটা ক্ষমতায়ন, এটা অধিকারের প্রশ্ন। তবে বাংলাদেশে এক্ষেত্রে সরকার আর এনজিওদের সহাবস্থানের ব্যাপারে একটা সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারণ রাজনৈতিক যেকোনও সরকার স্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্বারা অনেক সময় প্রভাবিত হয়ে থাকে। চর, জলাভূমি কিংবা বনভূমিতে ক্ষমতাহীন নিম্নবৃত্তরা চাষাবাদ করতে গেলেই গেলেই তাদের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধি বা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি নতুন বাংলাদেশে এমন সমস্যা থাকবে না। স্থানীয় মানুষদের মোবিলাইজ করার নতুন কাজ হবে এনজিওদের এবং সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের সহায়ক হিসেবে কাজ করবেন। কিন্তু যদি দখলদারিত্ব থাকে, অন্যায় প্রভাব বিস্তার থাকে, তাহলে বিদেশিরা যে সহায়তা দিতে চাচ্ছে, যে কাজগুওলো করতে চাচ্ছে সেখানে সাংঘর্ষিক অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।’
এ সময় কিছু এনজিও’র সমালোচনাও করেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘এনজিওদের মধ্যেও কিছু প্রবণতা থাকে, অনেক টাকার লেনদেন হয়। কিছু কিছু এনজিওর কর্তাব্যক্তিরা সংস্থার নামে জমি না কিনে নিজের নামে কিনেছেন।’
সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন গণসাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর পুনর্গঠন ও দারিদ্র্য বিমোচনে এনজিওগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়ন ও জলবায়ু অভিযোজনসহ নানা ক্ষেত্রে এনজিওগুলো দেশের জিডিপিতে পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ অবদান রাখছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক সহায়তা কমে এসেছে।’
ওইসিডি’র তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক অনুদান প্রবণতা ২০২৩ সালের ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুদান হ্রাসে ৫০ হাজার উন্নয়নকর্মী চাকরির ঝুঁকিতে পড়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এনজিও খাতকে এখন অভ্যন্তরীণ উৎস যেমন করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), সামাজিক উদ্যোগ, প্রবাসী অনুদান এবং স্থানীয় তহবিল সংগ্রহের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।’
জিপিই’র সহযোগিতায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধূরী।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স (ব্রান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং) কান্ট্রি হেড বিটপি দাশ চৌধূরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদাৎ হোসেন, সিপিডির রিসার্চ ডিরেক্টর ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
উন্মুক্ত আলোচনায় আরও বক্তব্য রাখেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কনসালটেশন কমিটির প্রধান ড. মনজুর আহমেদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফারহানা হক, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব হাসিনা আক্তার, পিকেএসএফ এর ডিজিএম আশরাফুল হক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদফতরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ের পরিচালক ড. একিউএম শফিউল আজম, ভার্কের নির্বাহী পরিচালক ইয়াকুব হোসেন, ফরিদপুরের রাসিনের নির্বাহী পরিচালক আসমা আক্তার মুক্তা, সিলেটের আকবেটের নির্বাহী পরিচালক আসাদুজ্জামান সায়েম, রাজশাহীর এসেডো নির্বাহী পরিচালক রবিউল ইসলাম, নেত্রকোণার সেরার নির্বাহী পরিচালক মজিবুর রহমান, সিএসও অ্যালায়েন্স -এর সেক্রেটারিয়েট টিম মেম্বার ও আইআইডির যুগ্ম পরিচালক সানজিদা রহমান।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন গণসাক্ষরতা অভিযান এর উপ-পরিচালক তপন কুমার দাশ।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, প্রাইভেট সেক্টর, গণমাধ্যম, ও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত গণসাক্ষরতা অভিযানের সহযোগী সংগঠনের দেড় শতাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।