‘ফুল কলিরে ফুল কলি, বল না এটা কোন গলি’

‘ফুল কলিরে ফুল কলি, বল না এটা কোন গলি’

ফুলের কথা মনে হলে আশরাফ ওরফে ‘আচ্ছু’কে মনে পড়ে। স্কুলজীবনে আচ্ছুই ছিল আমার প্রথম বন্ধু, যে সহপাঠীকে ফুল দিয়ে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই সহপাঠী পরদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে নালিশ করে দিলে আচ্ছুকে নেওয়া হয় স্যারদের রিমান্ডে। বেত ভাঙা হয় তার পিঠে। আচ্ছুর কান্না দেখে এক স্যারের মায়া হয়। তিনি কাব্য করে বলেন- শোন, ফুলকে ভালোবাসলে সুবাস পাবি। আর মানুষকে ভালোবাসতে গেলে কান্না উপহার পাবি। বল, মানুষ না ফুল? কোনটাকে ভালোবাসবি এরপর থেকে?শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয়বার ছাড়া আচ্ছু আর কখনও প্রেমের দিকে যায়নি, ফুলের দিকেই গিয়েছিল। একবার ভৈরব নদে স্নান করতে আসা তিন মেয়েকে দেখে আচ্ছুর খুব ভালো লেগেছিল। সে গেয়ে উঠেছিল সেই বিখ্যাত গান- ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল/ ফুল নেবো না অশ্রু নেবো ভেবে হই আকুল! স্নানকন্যারা নাকি চিৎকার করে মানুষ জড়ো করেছিল আর আচ্ছু কেটে পড়েছিল। স্যারদের রিমান্ডের কথা নিশ্চয়ই ওর মনে ছিল! একালে আচ্ছু ‘মবের’ পাল্লায় পড়তো নির্ঘাত।সে যাহোক পরিণত বয়সে আচ্ছু একবার অনেক গোলাপ নিয়ে এক মেয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল। সেই মেয়ে এসে আচ্ছুকে ফুল বিক্রেতা ভেবে নাকি দুটো গোলাপ কিনতে চেয়েছিল। এই ঘটনার সত্য মিথ্যা আজও জানতে পারিনি। তবে এটা এক দুরন্ত সত্য যে আচ্ছু শেষমেশ ফুলের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছিল। ফুল ব্যবসার অনুপ্রেরণা সে পেয়েছিল নাকি সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ সাহেবের কাছ থেকে। এরশাদ সাহেব নাকি রজনীগন্ধা ফুল খুব ভালোবাসতেন। এরশাদ সাহেবের প্রেম নিয়ে অনেক মুখরোচক কাহিনি প্রচলিত ছিল। তবু তার দলের লোকরা মিছিলে স্লোগানে বলতো- এরশাদের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র। এমন স্লোগান শেষে অনেকেই জানতে চাইতো- এই ফুল কি ধুতুরা ফুল?কবি সাহিত্যিকদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস নাকি ফুল। ফুল নিয়ে লেখা কবিতা বা গানের লক্ষ-কোটি উদাহরণ দেওয়া যাবে। আমরা সেদিকে না যাই। প্রিয়তমার জন্য কবিরা সব ফুলদের বরাদ্দ দিয়ে দিয়েছেন। যেমন, তোমার জন্য সকল গোলাপ আর রজনীগন্ধা! সব ফুল প্রিয়তমাকে দিয়ে দিলেও কোনও বিতর্ক ওঠে না। শুধু প্রতীক বা মার্কা বরাদ্দের মধ্যে ফুল এসে পড়লেই ঝামেলা?ফুল কিন্তু প্রতীক হিসেবে আগেই এসেছে, কোনও ঝামেলা হয়নি। যেমন, গোলাপ। জাকের পার্টিকে (আটরশি হুজুরের পার্টি। বলা হয় যত মুরিদ ভোটার তার দশ ভাগের একভাগও না। আরও বলা হয় এরশাদ সাহেব নাকি একদা আটরশি হুজুরের ব্রান্ড অ্যাম্বাসাডার ছিলেন!) যখন গোলাপ ফুল প্রতীক দেওয়া হয় তখন বিন্দুমাত্র চেঁচামেচি হয়নি। কিন্তু শাপলা ফুল আলোচনায় আসার পর পর এটা নিয়ে মিডিয়া সরগরম থাকে। বলা হচ্ছে জাতীয় প্রতীক কীভাবে একটা দলের প্রতীক হয়? বলা হচ্ছে জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় পশু বাঘ, জাতীয় খেলা হাডুডু বা ফুটবলেও কোনও সমস্যা নেই। সমস্যা কেন হবে শাপলায় যদি ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লায় কোনও সমস্যা না থাকে?যেসব মেয়েদের নাম আছে শাপলা, তারাও অটোমেটিক্যালি আলোচনায় চলে এসেছেন। একজন অবশ্য ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন- ‘আমি শাপলা। ছোটকাল থেকেই আমি শাপলা। আমার নামে কোনও ঘাপলা নাই। তবে কলি আমার ছোট বোনের নাম! এটা নিয়েও কোনও ঘাপলা কইরেন না!’কিন্তু ঘাপলা খানিক হয়েছে। দেওয়া সম্ভব না বললেও নির্বাচন কমিশন শাপলা কলিকে প্রতীক তালিকায় সংযুক্ত করেছেন। নিবন্ধন না পাওয়া নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি বলছে- ‘কলি যখন এসেছে শাপলাও আসবে। আমরা শাপলা না নিয়ে নির্বাচন করবো না’! অবশ্য কেউ কেউ বকুল ফুল বকুল ফুল গানের প্যারোডি করে বলেছেন-‘ শাপলা ফুল শাপলা ফুল কলি দিয়া মন কেন ভাঙ্গাইলি?’কিন্তু আজ ২ নভেম্বর ঘটলো ভিন্ন ঘটনা। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘জনতার মধ্যে ইতোমধ্যে “শাপলা” প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে এখন যুক্ত হচ্ছে “কলি”। আমরা ইনশাআল্লাহ “শাপলা কলি” নিচ্ছি।’ যাহোক, প্রিয়তমাকে ফুল দিতে যান, ফুল না নিলে কিন্তু ফুলদানকারীর মন ভাঙে! আবার সান্ত্বনাস্বরূপ এ কথাও প্রচলিত আছে যে- একটা মন ভাঙা আর মসজিদ ভাঙা সমান কথা! কিন্তু শাপলার এত চাহিদা কেন? যদি না জেনে থাকুন তাহলে জেনে রাখুন-‘ শাপলায় কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ রয়েছে। এটা শরীর ঠান্ডা রাখে ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ায় আর হজমে সাহায্য করে। শাপলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।’শাপলা শরীরের যে রঙ তার উজ্জ্বলতা বাড়ায়। মেয়েদের কাছে কী এ কারণে শাপলা প্রিয়? তবে শাপলার অপকারিতাও আছে। বেশি খেলে জ্বর সর্দি-কাশি হতে পারে। হজমের সমস্যাও হতে পারে। শাপলার প্রতি আপনার পরিমিতি বোধ থাক।এ দেশে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে হতদরিদ্র মানুষের খাবার ছিল পথের পাশে অবহেলায় বড় হওয়া কচু আর জলে ফুটে থাকা শাপলা ও এর ডাঁটা! জানি না এ কারণে শাপলা জাতীয় ফুল কিনা। তবে কচুকেও সম্মান দেওয়া উচিত। আমাদের জাতীয় অনেক কিছুর কিন্তু দাম নেই। ধরেন জাতীয় ফল কাঁঠাল। ফল হিসেবে কাঁঠাল তেমন জনপ্রিয় না। জাতীয় খেলা কাবাডি বা হাডুডু।কাবাডির জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড়ের নাম বলতে পারবেন? শাপলাও তেমন আলোচনায় ছিল না। জাতীয় নাগরিক পার্টিকে এ কারণে ধন্যবাদ জানানো যেতে পারে যে তারা শাপলাকে এক ধরনের আলোচনায় এনেছেন। তবে জাকের পার্টির গোলাপ ফুল যা করতে পারেনি শাপলার কলি কি তা পারবে? শাপলা কলির কারণে কি এনসিপি কিছু বেশি ভোট পাবে?আমরা শুধু ফুল নিয়ে থাকি। প্রিয়তমার খোঁপায় গোজা ফুলটাকে নিয়ে ভাবি। পারমাণবিক অস্ত্রের বদলে শাপলা চাষে মনোযোগ দেই। বুলেট বোমা সব ফুল হয়ে ফুটুক। শাপলা নিয়ে সৌন্দর্যের বা রান্নার প্রতিযোগিতা হোক। শাপলা দিয়ে একশত রান্নার রেসিপি দিক রন্ধন বিশেষজ্ঞরা! এনসিপি বলা শুরু করতে পারে- আমাদের নাম এই বলে খ্যাত হোক- আমরা শাপলা কলির লোক! উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞরা আমাদের জানাতে পারেন শাপলা কয় ধরনের আছে, বিভিন্ন প্রজাতির শাপলার নাম ও ছবি। শেষমেশ শাপলা নিয়ে একটা গল্প বলে বিদায় নেই।এক লোক ও তার স্ত্রী নৌকায় ঘুরতে বের হয়েছেন। পাশে আরেকটি নৌকায় রয়েছে স্ত্রীর বান্ধবী। তারা আগে পিছে করে হাওরের সৌন্দর্য দেখছিলেন। ওই লোকের বউয়ের বান্ধবী হাওরে অসম্ভব সুন্দর এক শাপলা দেখে সেটি ছিঁড়তে গেলো। কথা বলে উঠলো সেই ফুটে থাকা শাপলা। বললো- শাপলা ছিঁড়তে গেলে তুমিও শাপলা হয়ে যাবা। বান্ধবী বিশ্বাস করলো না। সে শাপলা ছিঁড়তে গিয়ে নিজেও শাপলা হয়ে গেলো। খানিক পরে লোকটা খেয়াল করলো তার বউয়ের বান্ধবী নেই। খুঁজতে বের হলো ওই লোকের বউ। দুটো সুন্দর শাপলা দেখে সেও ছিঁড়তে চাইলো। শাপলা বলে উঠলো- ছিঁড়তে গেলে তুমিও শাপলা হয়ে যাবা। ওই লোকের বউও মানা শুনলো না। সেও শাপলা হয়ে গেলো! এখন ওই লোক কীভাবে বুঝবে কোন শাপলা তার বউ আর কোনটা তার বউয়ের বান্ধবী?লোকটা চিন্তা করেও কোনও সমাধান পেলো না। নৌকার মাঝি বললো- সাহেব উপায় আছে একটা। শাপলা ফুলে চুম্মা দেন। যে শাপলা আপনার বউ সেটাতে চুম্মা পড়লে কোনও কিছু ঘটবে না। যেই শাপলা আপনার বউয়ের বান্ধবী সেটায় পড়লে আপনারে কইষা মারবো বউ শাপলা। এতে আপনি বুইঝা ফেলবেন!রাজনীতির ফুল কিংবা চুম্মা দুটোই রিস্কি। ফুলে যেমন কাঁটা থাকে, কীট থাকে, তেমনি ফুলের বাগানে সাপও থাকে। আর ঠোঁটে জীবাণু আছে কিনা তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে কবিতার লাইন- ‘যারা চুমু খায় তারা সবাই জানে না/ কেউ কেউ শুধু জানে/ অমলিন শূন্যতা ওঁত পেতে থাকে দু’ঠোঁটের মাঝখানে!রাজনীতির শূন্যতা ভালো জিনিস না। শাপলা কলির জন্য শুভ কামনা।

লেখক: রম্যলেখক

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin