বেঁচে থাকলে আজ (৯ অক্টোবর) ৮৫তম জন্মদিন উদযাপন হতো জন লেননকে ঘিরে; অবশ্যই সেটি বিশ্বজুড়ে। তিনি নেই বলে যে সেসব আনুষ্ঠানিকতা থমকে আছে, তাও নয়। বরং বছর ঘুরে লেনন যেন ফিরে ফিরে আসেন নতুন নতুন অবয়বে গল্পে ও সুরে।
এক লেনন ভক্তের প্রতিক্রিয়া দিয়েই শুরু করা যাক এই জন্মদিনের আলাপ।
‘‘পুনেতে আমার কলেজ-জীবনের একটা প্রিয় জায়গা ছিল—দ্য হিডেন প্লেস। রেস্তোরাঁর একপাশে ঝোলানো ছিল এক মজার পেইন্টিং, নাম রক এন রোল হল অফ ফেম। ছবির কেন্দ্রে ছিলেন স্বয়ং জন লেনন, গিটার হাতে বসে আছেন হুক্কার সামনে, যেন পল ম্যাকার্টনির সঙ্গে গল্পে মগ্ন—সম্ভবত কোনও বিতর্কে, সেই বিখ্যাত ‘লেননীয়’ ভঙ্গিতে। যদি আপনি সাধারণ রকপ্রেমী হন—যিনি এখনও পিংক ফ্লয়েড-এর ‘ডার্ক সাইড অব দ্য মুন’-এর রহস্য খুঁজছেন বা ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’র কিংবদন্তি গিটার সলোর বাইরে জীবন খুঁজে পাচ্ছেন—তাহলে হয়তো এই ছবিটা স্রেফ ‘কুল’ মনে হবে। কিন্তু যে ভক্ত জন লেননের সংগীতের পেছনের গল্প, তার অনুপ্রেরণা, আর গিটার নামিয়ে রাখার পর তার আচরণ জানে, সে একটু অস্বস্তি অনুভব করবে—কারণ এই গল্পগুলো লেননকে খুব একটা ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে দেখায় না। আর সেই অনুভূতিটা সহজে মুছে ফেলা যায় না।’’ jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68e7c0d4cc3e6" ) ); বিটলস: স্বপ্নের সমাপ্তি
বিটলস আজও সর্বত্র—তাদের ভাঙনের ৫৫ বছর পরেও। ১২টি স্টুডিও অ্যালবাম, অসংখ্য জয়েন্ট, কোটি বিক্রি, লাখো ভাঙা হৃদয়ের পর তারা ঘোষণা দেয়—শেষ।
কেন এই বিচ্ছেদ—তা নিয়ে নানা ব্যাখ্যা আছে। তাদের শিল্পের পরিপূর্ণতা একসময় তাদের ভক্তদের দেবতা বানিয়ে দেয়। সংগীত হয়ে ওঠে আন্দোলন। একসময় তারা সেই ভক্তদের পেছনে দৌড়াতে শুরু করে, যাদের একসময় নেতৃত্ব দিত। ম্যানেজার ব্রায়ান এপস্টেইনের মৃত্যু আরও চাপ সৃষ্টি করে। জর্জ হ্যারিসন নিজের লেখা গান প্রকাশের সুযোগ না পেয়ে হতাশ হন, আর লেনন আশ্রয় নেন হেরোইনে।
নেশা, হিংসা ও বিষাক্ত সম্পর্ক
অ্যালবার্ট গোল্ডম্যানের লেখা ‘দ্য লাইভস অব জন লেনন’ বইয়ে বলা হয়েছে, জন কখনও পুরোপুরি মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত হতে পারেননি। তার দুই স্ত্রী—সিনথিয়া পাওয়েল ও ইয়োকো ওনো—দুজনেই এ বিষয়ে বলেছেন। লেখক উল্লেখ করেন, লেননের অলসতা ও শক্তিশালী নারীদের ওপর নির্ভরশীলতা তার নেশাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তার মাদকাসক্ত মস্তিষ্ক ও অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব এক ভয়ংকর সংমিশ্রণ তৈরি করে—যা একদিকে তাকে গভীর লিরিক লিখতে সাহায্য করলেও, অন্যদিকে করে তোলে সহিংস ও অস্থির। jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68e7c0d4cc432" ) ); ব্যান্ডমেটদের সঙ্গে সংঘাত
লেননের কলম একসময় তীব্র হয়ে ওঠে প্রাক্তন ব্যান্ডমেটদের বিরুদ্ধে। তার গান ‘হাউ ডু ইউ স্লিপ?’ আসলে পল ম্যাকার্টনিকে উদ্দেশ্য করে লেখা এক আক্রমণ। কারণ, লেনন মনে করেছিলেন পল তার অ্যালবাম ‘র্যাম’-এ তাকে ব্যঙ্গ করেছেন। ১৯৭০ সালে রোলিং স্টোন-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেনন বলেন, ‘আমি বিটলস-এ বিশ্বাস করি না... স্বপ্ন শেষ। আমি শুধু বিটলস নিয়ে বলছি না—পুরো প্রজন্মের এক স্বপ্নের সমাপ্তি। এখন বাস্তবে ফিরে আসতে হবে।’ jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68e7c0d4cc45c" ) ); স্বামী হিসেবে ব্যর্থ জন
প্রথম স্ত্রী সিনথিয়াকে জন সবসময় বলতেন, ইয়োকো ওনোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার আগেই তাদের বিবাহ ‘মৃত’ ছিল। ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে সিনথিয়াকে লেখা এক খোলা চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘তুমি আর আমি দুজনেই জানি, এলএসডি বা ইয়োকো আসার অনেক আগেই আমাদের বিবাহ শেষ হয়েছিল… এটাই বাস্তবতা।’
সিনথিয়া তার ২০০৫ সালের আত্মজীবনী ‘জন’ বইয়ে লেখেন, ‘জনের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর আমি যতই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চেষ্টা করি না কেন, আমি সারাজীবন জনের প্রথম স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত থাকব।’ jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68e7c0d4cc485" ) ); ইয়োকোর সঙ্গে সম্পর্কের আগেই লেননের অসংযম শুরু হয়। সিনথিয়া তখন প্রায়ই ব্যান্ডের সঙ্গে ট্যুরে যেতেন। ২২ বছর বয়সে গর্ভবতী হলে জন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু ছেলে জুলিয়ান জন্মের পরও সংসারে শান্তি ফেরেনি। জনের ঈর্ষা, সহিংসতা আর অসংযম সিনথিয়ার জীবনের অংশ হয়ে যায়। ব্যান্ড ম্যানেজার ব্রায়ান একবার তাকে বলেছিলেন, সংসার বাঁচাতে হলে জনকে ঘরে রাখতে হবে।
সিনথিয়া পরে লিখেছিলেন, ‘জন তখন দ্রুত বিখ্যাত আর ধনী হয়ে উঠছিল, আর আমি থাকতাম সপ্তাহে পাঁচ পাউন্ড ভাড়ার এক মলিন ঘরে, তার সন্তানের সঙ্গে।’
শেষ চেষ্টা হিসেবে সিনথিয়া ভেবেছিলেন, ব্যান্ডের ভারতের সফর হয়তো কিছুটা শান্তি আনবে—কিন্তু হলো উল্টোটা। সেখান থেকেই জনের জীবনে ইয়োকোর প্রবেশ। jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68e7c0d4cc4ae" ) ); প্রেম, প্রতিবাদ ও প্যারাডক্স
জন ও ইয়োকোর সম্পর্ক একদিকে ভালোবাসা, অন্যদিকে বিশৃঙ্খলা। ১৯৬৯ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তারা আয়োজন করেন বিখ্যাত ‘বেড-ইন ফর পিস’ প্রতিবাদ। অ্যামস্টারডাম হিলটন ও মনট্রিয়ালের কুইন এলিজাবেথ হোটেল-এ এক সপ্তাহ বিছানায় শুয়ে থেকে ভালোবাসা ও শান্তির বার্তা দেন—মিডিয়া ও ভক্তদের সামনে। কিন্তু এই বার্তা তখন অনেকের কাছেই ভণ্ডামি মনে হয়েছিল—কারণ জন নিজেই ছিলেন সহিংস!
১৯৬৮ সালের এক চিঠিতে জনের গৃহপরিচারিকা লেখেন, জন তার ছেলে জুলিয়ানকে প্রায়ই ছোটখাটো ভুলের জন্য মারতেন।
শেষ অধ্যায়
বহুজন বলেন, ইয়োকোর সঙ্গে সম্পর্ক জনের ‘আদর্শ প্রেম’ খোঁজার ফল, কিন্তু তাও টিকল না। তাদের সম্পর্কের মাঝেই জন নিজের সহকারী মে প্যাং-এর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। ‘দ্য লস্ট উইকেন্ড: দ্য লাভ স্টোরি’ ডকুমেন্টারিতে প্যাং বলেন, ইয়োকোই নাকি তাকে প্রথম বলেছিলেন, ‘জন আর আমি একসঙ্গে ভালো যাচ্ছি না। তুমি তার সঙ্গে বাইরে যাও।’ প্যাং প্রথমে রাজি হননি, কিন্তু পরের ঘটনাগুলো দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
শেষমেশ ইয়োকো আবার জনকে ‘ফিরিয়ে’ নেন, দুজনে বিয়ের অঙ্গীকারও নবায়ন করেন। ১৯৮০ সালের ৮ ডিসেম্বর নিউইয়র্কের বাড়ির সামনে আততায়ীর গুলিতে জনের জীবন শেষ হয়। জীবনটা থামে, কিন্তু তার সংগীত ও সময় নিয়ে গবেষণা বা কৌতূহল এখনও সমান্তরাল বইছে বিশ্বজুড়ে। jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68e7c0d4cc4d3" ) ); এক কিংবদন্তির অন্ধকার দিক
জনের শৈশব ছিল কঠিন—মায়ের মৃত্যু, বাবার পরিত্যাগ—সবকিছু তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু তবু এগুলো তার আশেপাশের মানুষদের প্রতি তার আচরণের অজুহাত হতে পারে না। তিনি ছিলেন উদ্ধত, অভদ্র, এমনকি সহকর্মীদের প্রতিও অসম্মানজনক। জর্জ ও পলকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক গান লিখেছেন। নিজের জীবনযাত্রায় যারা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, তাদেরই কষ্ট দিয়েছেন।
তাই ‘লেজেন্ড’ শব্দটি জন লেননের ক্ষেত্রে ব্যবহার করার আগে একটু থেমে ভাবা উচিত—কারণ এই সংগীত-‘জিনিয়াস’ ছিলেন একই সঙ্গে এক ভাঙা, হিংস্র, ঈর্ষাকাতর এবং বিতর্কিত মানুষ, যার নামের পাশে হয়তো একটি অ্যাস্টেরিক্স চিহ্ন থাকা উচিত। jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68e7c0d4cc4f7" ) ); তথ্যসূত্র: রোলিং স্টোন, দ্য গার্ডিয়ান ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস