যখন কারও বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ওঠে এবং যখন কোনও একটা পক্ষ চায়— সেই ব্যক্তিকে জবাবদিহির বাইরে রেখে দিতে, তখন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার ব্যবস্থা করাকে ‘সেফ এক্সিট’ বলে। রাজনীতিতে ‘সেফ এক্সিট’ হলো— কোনও রাজনৈতিক নেতা বা দল যেন মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে, আইনগত জটিলতা বা জনরোষ এড়িয়ে, নিরাপদে ক্ষমতা বা পদ থেকে সরে দাঁড়াতে পারে, সেই ব্যবস্থা করে দেওয়া।
যদিও দুর্ঘটনার সময় এই শব্দের ব্যবহার আছে। সেক্ষেত্রে ‘সেফ এক্সিট’ হলো— যেকোনও দুর্ঘটনা থেকে দ্রুত বের হওয়ার উপায়। আবার আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ভুক্তভোগী দরজা খোলার সময় নাও পাওয়া যেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ‘সেফ এক্সিট’ হচ্ছে— জানালা বা অন্য নিরাপদ পথ দিয়ে বের হওয়ার সুযোগ।
সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও সেফ এক্সিটের আলাপ শুরু হয়েছে— জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের দেওয়া বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘...অনেক উপদেষ্টা নিজেদের আখের গুছিয়েছেন, অথবা গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে বিট্রে (প্রতারণা) করেছেন। যখন সময় আসবে, তখন আমরা এদের নামও উন্মুক্ত করবো।’’ তবে তিনি কারও নাম উল্লেখ না করায় আলোচনা ডালপালা মেলেছে। কাদের ইঙ্গিত করলেন তিনি। তার বক্তব্যের পর একে একে তিনজন উপদেষ্টা এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
তিন উপদেষ্টা যা বলেছেন
নাহিদের সেফ এক্সিট আলোচনায় সাড়া দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের তিনজন উপদেষ্টা। বুধবার (৮ অক্টোবর) দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘‘উপদেষ্টাদের মধ্যে কারা সেফ এক্সিট (নিরাপদ প্রস্থান) নিতে চান, এ বিষয়গুলো নাহিদ ইসলামকেই পরিষ্কার করতে হবে। উনি যদি কখনও পরিষ্কার করেন, তখন সেটি নিয়ে সরকারের বক্তব্যের কথা আসে।’’
বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) সকালে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে রেলপথ, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, ‘‘শিক্ষকতার সূত্রে, ইতোপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার নিশ্চিত সুযোগ গ্রহণ করিনি। তাই, আজ ৭২+ বছর বয়সে আমাকে যদি সেফ এক্সিটের কথা ভাবতে হয়, তা হবে গভীর দুঃখের বিষয়!!!’’
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘‘যাদের একাধিক দেশের পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব নেওয়া, তারাই আবার অন্যদের সেফ এক্সিটের তালিকা করে। যারা ৫ আগস্ট পালিয়েছিল, তাদের সিমপ্যাথাইজাররা কষ্টে মরে যাচ্ছে। বারবার ফ্যাসিস্টদেরই পালাতে হবে। আমাদের জন্ম এদেশে, মৃত্যুও এদেশের মাটিতেই হবে, ইনশাআল্লাহ। ফ্যাসিস্ট, খুনিদের সঙ্গে লড়তে লড়তে আমার ভাইদের মতো শহীদি মৃত্যু কামনা করি।’’
বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘সেফ এক্সিট’
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারেব ঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। দেশে না থাকায় রক্ষা পান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ওশেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ দিয়ে বিচার বন্ধ করা হয়। আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। এটাই ছিল বাংলাদেশর ইতিহাসে প্রথম ‘সেফ এক্সিট’। এরপর ২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরানোর জন্য ‘সেফ এক্সিট’ নিয়ে পরিকল্পনার কথা আলোচিত হয়েছিল। সে সময় ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়ন করতে এই দুই নেত্রীকে কারাগারে পাঠানো হয়। সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রআন্দোলন গড়ে উঠলে তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারের হাতে দায়িত্ব দিয়ে দেশত্যাগ করেন ফখরুদ্দিন ও মঈনউদ্দিন দুজনেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘সেফ এক্সিটের’ গল্প সামনে আসে মূলত তখনই— যখন কোনও শক্তিশালী সরকার বা নেতা ক্ষমতা ছাড়তে অনিচ্ছুক। আর বিরোধী পক্ষ বা আন্তর্জাতিক শক্তি যখন মনে করে, সমঝোতা ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়।
‘সেফ এক্সিট’ দেওয়া হয় কেন
‘সেফ এক্সিট’র কারণ হিসেবে সংঘাত কমানোর কথা বলা হয়ে থাকে। হঠাৎ পদত্যাগ বা ক্ষমতা ছাড়লে সংঘাত, সহিংসতা বা প্রতিশোধমূলক রাজনীতি তৈরি হতে পারে। ‘সেফ এক্সিট’ দিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি এড়ানো হয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নেতা যেন নিজেকে পরাজিত বা অপমানিত মনে না করেন, তার জন্য ‘সেফ এক্সিট’ দিয়ে ‘সম্মানজনক বিদায়’ দেওয়ার এটা একটা আন্তর্জাতিক কৌশল। সেক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগকে ‘সেফ এক্সিটের’ উদাহরণ বলা যেতে পারে বলে দাবি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, রাজনীতিতে ‘সেফ এক্সিট’ মানে হলো— একটি শান্তিপূর্ণ, সম্মানজনক ও নিরাপদ পথ তৈরি করা, যাতে ক্ষমতা ছাড়াটা সংঘাত বা প্রতিশোধে না গড়ায়।
কখন ‘সেফ এক্সিট’ দরকার হয় প্রশ্নে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘যখন কারও ওপর কোনও দায়িত্ব অর্পিত হয় এবং তিনি মনে করেন যে, দায়িত্ব পালনের মেয়াদের পরে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি আছে, জবাবদিহির মধ্যে পড়তে হতে পারে, এমন কোনও তথ্য আছে— যা বিব্রতকর হতে পারে, তখন ‘সেফ এক্সিটের’ দরকার হয় বলা হয়।’’ ড. জামান বলেন, ‘‘নাহিদ ইসলামের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, তিনি নিজে উপদেষ্টা ছিলেন। ভেতরের মানুষ হিসেবে তার কাছে তথ্য আছে। যদি না তিনি শুধু শুধু একটা কথা বলে রাজনৈতিক সুবিধা পেতে না চান। আমার মনে হয়, একবার যখন তিনি আলোচনা তুলেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে যে তথ্যপ্রমাণ তার কাছে আছে, সেজন্যই বলা।’’
নাহিদ ইসলাম এই সময়ে কেন এ ধরনের বক্তব্য দিলেন, তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন— জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এনসিপিতে অনেকে আছেন হুটহাট কথা বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে এটা নাহিদ ইসলাম। নাহিদের ব্র্যান্ডিং কিন্তু সেরকম না। উনি এ ধরনের কথা সাধারণত বলেন না। উনি যে দুটো অভিযোগ করেছেন— আখের গুছানো ও প্রতারণা করা এবং পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে অ্যালাইন্ড হয়ে গেছে। সামনে নির্বাচন আছে, এসময় কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যদি উপদেষ্টারা অ্যালাইন্ড হয়ে যান, তাহলে কী হবে? কারা কারা কার সঙ্গে অ্যালাইন্ড হয়েছে, কারা আখের গুছালেন, কারা প্রতারণা করলেন— এগুলো জানা জরুরি। উনি সরকার থেকে বের হয়েছেন, এটা ওনার বলা জরুরি। এত ভাসাভাসা কথার কোনও অর্থ থাকতে পারে না।’’
কেন এ সময় এমন একটা কথা বললেন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘আমি ধারণা করি, এনসিপির সঙ্গে সরকারের কোনও ইস্যুতে টানাপোড়েন চলছে এবং তারা মনে করছেন— সরকারের ওপর চাপ তৈরি করবেন। যেহেতু তিনি সরকারে ছিলেন, তার কথায় মানুষ গুরুত্ব দেবে। কারণ তিনি ভেতরের মানুষ হিসেবে অনেক কিছু দেখেছেন। আবারও বলছি, এটা নাহিদ ইসলাম, তার দলের অন্য কারও মতো তিনি নন।’’