জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন     

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন     

দীর্ঘ সময়ের অপশাসনের পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের দাবি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচন ঘিরে চলছে নানান ধরনের ষড়যন্ত্র। যে আশা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়েছিল, সে আশা এখন ভঙ্গ হয়ে গেছে। যে ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের অভিপ্রায়ে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তি দায়িত্ব দিয়েছিল, তিনি সেটি সফল না করে উল্টো বিভেদের রেখা টেনে দিয়েছেন।

ঐকমত্যের নামে বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টিকে তিনি দূরে ঠেলে দিয়েছেন। এমনকি দেশের অনেকগুলো রাজনৈতিক দলকে তিনি আলোচনার টেবিলে আমন্ত্রণ জানাননি। এতে করে ভবিষ্যতে চরম রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে। যার দায় বর্তমান সরকারের সবাইকে নিতে হবে।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে দেশে বিভেদ সৃষ্টি করে রেখেছিল। ঠিক একই কায়দায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নামে অন্তর্বর্তী সরকারও দেশে বিভেদের রেখা টেনে দিয়েছেন। এভাবে বিভেদ করে কখনও কোনও জাতি এগুতে পারেনি। বরং এমন সংকটময় মুহূর্তে যদি অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করে বাকি সকলের রাজনৈতিক স্পেস খুলে দেওয়া হতো, বরং তখন দেশে একটি স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করতো। কিন্তু ড. ইউনূসের সরকার অন্যায়ভাবে নিপীড়কের ভূমিকা নিয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনেও উল্লেখ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করছে।

বিচার নামে চলছে প্রহসন

বিচার মানে বিচারের নামে প্রহসন নয়। বিচারক ও আইনজীবীরা যদি রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে পক্ষপাতদুষ্ট হোন, সেখানে ন্যায় বিচার আশা করা যায় না। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে শাস্তি প্রদান আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার পরিপন্থী। উল্লেখিত বিষয় সমূহ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। 

১. ছাত্র জনতার হত্যার বিচার হচ্ছে আমরা সমর্থন করি। তবে, আন্দোলনের সময়ে পুলিশ যারা মারা গেছেন, তাদের হত্যাকাণ্ডের বিষয়েও বিচার হওয়া দরকার।

২. কোন পরিস্থিতিতে কতজন মারা গেছেন ও কতজন আহত হয়েছেন, সে সব বিষয়েও তদন্ত ও বিচার হওয়া আবশ্যক।

৩. ছাত্র সমন্বয়কদের কয়েকজন দাবি করেছেন যে, আন্দোলনের ভেতরে অনেকেই অস্ত্র ব্যবহার, হত্যা ও নাশকতার সঙ্গে জড়িত। এটি নিয়েও যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন মনে করি।

৪. পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী জুলাই আন্দোলনের সময় সারা দেশে পুলিশের উপর হামলায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্বরত অবস্থায় মারা গেছেন। এর মধ্যে ৪ ও ৫ আগস্ট নিহত হয়েছে ৩৯ জন। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে শুনতে পেয়েছি নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। আমরা চাই নিহতের সঠিক সংখ্যা এবং কীভাবে তারা মারা গেলো; তার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হবে। দায়িত্বরত অবস্থায় নিহত পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত হোক এবং এই ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হোক।

বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালনকালে যদি কোনও পুলিশ সদস্য নিহত হয় তাকে রাষ্ট্রীয় তরফ থেকে সম্মানিত করা হয়। আমি মনে করি কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী বা আহতদেরকে বিনা বিচারে অপরাধী হিসাবে বিবেচনা না করে, তদন্ত সাপেক্ষে দায়িত্ব পালনরত হলে তার যথাযথ মর্যাদা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া জরুরি।     

কী অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে, কী পরিস্থিতিতে কোথায় কার উপরে জানা জরুরি। বি. জে. (অব.) শাখাওয়াত ৭.৬২ বোর রাইফেল ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানিয়ে ছিলেন, যা পুলিশ ব্যবহার করে না। সে ক্ষেত্রে এ অস্ত্র কে ব্যবহার করেছেন?

১. ছাত্রদের শরীরে ৭.৬২ বোর এর বুলেট পাওয়ার বিষয়ে, শাখাওয়াত সাহেব বক্তব্য দেন। তিনি এ প্রশ্ন তোলা মাত্র মাত্র তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ায় সন্দেহের অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে।

২. আন্দোলনকারীদের ভেতর কেউ এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছে কিনা, তদন্ত করা প্রয়োজন।

৩. আন্দোলনকে বেগবান করার উদ্দেশ্যে আন্দোলনকারীদের ভেতর কেউ যদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কিনা সেটিও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

সংস্কার হচ্ছে কাদের নিয়ে?

ঐকমত্য কমিশন বাস্তবে দেশে অনৈক্য সৃষ্টি করেছে। সংস্কার করার কোনও আইনগত বৈধতা অন্তর্বর্তী সরকার বা কমিশনের নেই। সংবিধানের অধীনে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার ও সংসদই শুধু সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারে। দেশের প্রায় সকল জনগণের সম্মতি থাকলেই পরবর্তী নির্বাচিত সংসদে সুপারিশকৃত সংস্কার সমূহের বৈধতা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষের মতামত অগ্রাহ্য করে সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে প্রস্তাবসমূহ গ্রহণযোগ্য নয় ও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দেখি না।

নির্বাচনে কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে?

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন আয়োজন করছেন সেখানে অন্যতম বৃহৎ দল আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে না। ১৪ দল ও জাতীয় পার্টিকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখার প্রচেষ্টা চলছে। যদি শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে রাখা হয়, যেহেতু এখনও নিষিদ্ধ করা হয়নি, তথাপি তাদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ-সুবিধা যে দেওয়া হবে না তা প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়। যেহেতু সরকারি মদদে ইতিমধ্যে জাতীয় পার্টির মিছিল সমাবেশে ও গণসংযোগে বাধা দান ও সহিংসতা করা হচ্ছে।  ফলে অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না এ নির্বাচন।

বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ গণহত্যার দায়ে নির্বাচন করতে পারবে না। তার আগে বিচার হতে হবে। তাহলে প্রশ্নটি হলো, জামায়াতে ইসলামী কিভাবে নির্বাচন করবে? তারাও তো গণহত্যাকারীদের দোসর। ১৯৭১ সালে যে দল বাংলাদেশ চায়নি, সেই দলেরও তো বিচার করতে হবে। কিন্তু ঐকমত্য কমিশন তো তাদের নিয়ে ঐক্যমতের আলোচনা করছে। আশ্চর্যের বিষয়! কমিশনের একটা লোকও কি বলতে পারেনি- জামায়াতও গণহত্যাকারী? আমরা বরং দেখছি, জামায়াত ও ছাত্রদের নতুন দল এনসিপির প্রতি এই সরকারের বিশেষ দুর্বলতা আছে।

বর্তমান সরকার নিরপেক্ষ নয়, এ সরকার অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে ইচ্ছুক নয়। তাদের সক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ। মনে রাখতে হবে, এই দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ জাতীয় পার্টির অনুসারী। এমনকি আওয়ামী লীগেরও অসংখ্য ভোট আমাদের এই সমাজে রয়েছে। পতিত হলেও তাদের সমর্থকদের তো কোনও অন্যায় নেই। অপরাধীদের সুষ্ঠু বিচার জরুরি আবার নিরাপরাধকেও তার স্বাভাবিক কার্যক্রম করতে দিতে হবে।  এই সরকারকে মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আদর্শ কখনও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া যায় না। সমাজ পরিবর্তন হয় ধীরে ধীরে। জনগণ নির্ধারণ করে রাষ্ট্রে কে রাজনীতি করবে আর কে করবে না। সেটি অবশ্যই হতে হবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে। কিছু লোক বিদেশি পাসপোর্টধারীরা এসে আমাদের দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন- এটি কাম্য নয়। দেশ চালাবে রাজনীতিবিদরাই। সুতরাং রাজনীতিবিদদের হাতেই রাজনীতিকে থাকতে দিতে হবে।

লেখক: চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin