লেবাননে হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। দেশটির সেনাবাহিনীকে দায়ী করে ইসরায়েল বলছে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে তারা যথেষ্ট দ্রুত পদক্ষেপ নেয়নি। তবে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশ্লেষকেরা বলছেন, লেবাননের সরকার ও সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে কাজ শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং সবচেয়ে বেশি দরকার ইসরায়েলের সহযোগিতা।
লেবাননের রাজনীতি বিশ্লেষক করিম এমিল বিতার বলেন, ‘ইসরায়েল প্রতিদিন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। এই পর্যায়ে লেবানন সরকারকে দোষ দেওয়া অন্যায়। সরকার হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
বিতার জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম ব্যারাক ইসরায়েল সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কাছ থেকে লেবাননের এই উদ্যোগের স্বীকৃতি আদায় করতে পারেননি। ইসরায়েল এখনও লেবাননের পাঁচটি পাহাড়ি এলাকা দখলে রেখেছে।
বিতর্কের কেন্দ্র হিজবুল্লাহ
লেবাননের গৃহযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ইসরায়েলি দখলবিরোধী প্রতিরোধ গোষ্ঠী হিসেবে হিজবুল্লাহর জন্ম। এরপর থেকে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন হিসেবে এটি টিকে আছে।
তবে হিজবুল্লাহর অস্ত্র অনেকদিন ধরেই লেবাননের রাজনীতিতে বিতর্কের বিষয়। চলমান ইসরায়েলি হামলার মধ্যেই গত আগস্টে সরকার সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়। আর তা হলো, গোষ্ঠীটির অস্ত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।
ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধে চার হাজারের বেশি লেবানীজ নিহত হন, যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক। ধ্বংস হয়েছে ডজনখানেক গ্রাম। যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিন লেবাননে হামলা চালাচ্ছে, যাতে এখনও শতাধিক বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
ক্ষুব্ধ হিজবুল্লাহ
সরকারের নিরস্ত্রীকরণ সিদ্ধান্তে হিজবুল্লাহ নেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক পরিষদের উপপ্রধান মাহমুদ কোমাতি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘যখন শত্রু প্রতিদিন আগ্রাসন চালাচ্ছে তখন কোনও রাষ্ট্রই নিজের মাটিতে প্রতিরোধকে দমন করে না।’
একসময় এমন সিদ্ধান্তে সরকার পতন ঘটাতে পারত হিজবুল্লাহ। কিন্তু গত বছরের যুদ্ধে তাদের প্রভাব অনেক কমে গেছে। ইসরায়েলের হামলায় সংগঠনের বহু শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন, ধ্বংস হয়েছে সামরিক ঘাঁটি, আর ইরান থেকে সরবরাহের পথও বন্ধ। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনে হিজবুল্লাহ আরও দুর্বল হয়েছে।
‘ইসরায়েল লেবানন আক্রমণে বদ্ধপরিকর’
ইসরায়েলের হামলা থামছে না, যদিও লেবাননের সেনাবাহিনী নিরস্ত্রীকরণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সেনাপ্রধান রোডলফ হাইকাল সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে এই প্রচেষ্টা স্থগিত করা লাগতে পারে।
বিতার বলেন, ‘ইসরায়েলের সর্বগ্রাসী নীতি হিজবুল্লাহর কঠোর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।’ তার মতে, ফ্রান্স, ভ্যাটিকান ও সৌদি আরবের মতো আন্তর্জাতিক পক্ষের চাপই এখন জরুরি।
লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক করিম সাফিয়েদ্দিন বলেন, ‘সরকারের কাঠামোগত শক্তি বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া নিরস্ত্রীকরণ সম্ভব নয়।’
হিজবুল্লাহর প্রতিক্রিয়া ও যুদ্ধের আশঙ্কা
১১ নভেম্বর এক ভাষণে হিজবুল্লাহ নেতা নাইম কাসেম বলেন, লেবানন সরকার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নতি স্বীকার করছে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘এটা শুধু অস্ত্রের বিষয় নয়, তারা এখন আমাদের সামর্থ্য ও অর্থনৈতিক উৎসকে লক্ষ্যবস্তু করছে।’
কাসেম আরও বলেন, ইসরায়েলি সীমান্তবর্তী উত্তরাঞ্চল হিজবুল্লাহর হামলার হুমকিতে নেই। গত নভেম্বর যুদ্ধবিরতির পর এসব হামলা বন্ধ হয়েছে।
ইসরায়েলি ও লেবাননি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে পারে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি ও সুস্পষ্ট লক্ষ্য না থাকায় নতুন যুদ্ধের সম্ভাবনা কম।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রবীহ দানদাচলি বলেন, ‘ইসরায়েল তাদের সব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এখন নতুন যুদ্ধ অর্থহীন ও ব্যয়বহুল।’
হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক কাসেম কাসির বলেন, ‘ইসরায়েল আগ্রাসন ন্যায্যতা দিতে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি কাজে লাগাচ্ছে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ইসরায়েলি আগ্রাসন বাড়লে সব বিকল্প খোলা রয়েছে।’
বিশ্লেষক বিতার বলেন, ‘ইসরায়েলের হামলা বৃদ্ধি মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর জন্য ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক।’