আদালত পাড়ায় বিষয়টি এতটাই প্রচলিত যে এটা নিয়ে কারও আর রাখঢাক নেই। সবাই জানে, সমন জারির সরকারি ফি শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে সমন জারি হয় তখনই, যখন তাতে যোগ হয় ‘অতিরিক্ত পয়সা’। এই ‘অতিরিক্ত পয়সার’ পরিমাণ নির্ধারিত হয় এক অদ্ভুত নিয়মে—যার থেকে যত নেওয়া যায়।দেশের বিচারব্যবস্থায় মামলার যাত্রা শুরু হয় সমন জারির মাধ্যমে। কোনও ব্যক্তি মামলা দায়ের করলে আদালত যে দলিলের মাধ্যমে বিবাদীকে কোনও নির্দিষ্ট তারিখে, নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট আদালতে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ দেন সেই নির্দেশনামাকে বা ওই দলিলটিকে সমন বলা হয়।মামলার কোনও পক্ষের ওপর সমন জারির প্রয়োজন হলে, সর্বোচ্চ চার জনের জন্য একটি দলিল জারি করা যায়, যার ফি নির্ধারিত আছে মাত্র দুই টাকা। এই টাকা ব্যয় করে সমনটি যার ওপর জারি করা হয়েছে তাকে পৌঁছে দিতে হয় জারিকারকের (যার ওপর সমন জারির দায়িত্ব অর্পিত)। তবে এই সংখ্যা চার জনের বেশি হলে, প্রত্যেক অতিরিক্ত ব্যক্তির জন্য আরও ৫০ পয়সা করে দেওয়া হয়। সহজ কথায়, কোনও মামলায় যদি পাঁচ জন বিবাদী থাকে, তবে তাদের ওপর সমন জারির ফি আইনানুসারে হবে মাত্র আড়াই টাকা, ছয় জন হলে ৩ টাকা। এভাবে প্রত্যেক অতিরিক্ত ব্যক্তির জন্য ৫০ পয়সা করে বাড়তে থাকবে।এখন প্রশ্ন হলো—আজকাল এই টাকায় কী পাওয়া যায়? এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা যেতে হলেও সর্বনিম্ন বাসভাড়া ১০ টাকা। আসামির সংখ্যা বেশি হলে প্রত্যেকের ঠিকানায় গিয়ে গিয়ে সমন পৌঁছে দিতে হয়। অথচ কী করে ভাবতে পারি এই দুই টাকার বিনিময়ে মামলার জারিকারক বিবাদীদের ঠিকানা ধরে ধরে তাদের কাছে যাবেন এবং আদালতের সমন পৌঁছে দেবেন! এ যেন তলোয়ার ছাড়া যুদ্ধে পাঠানোর মতো অবস্থা।এর ফলে যেটা হয়, টাকার হিসাবটা শুধু কাগজে-কলমেই লেখা থাকে। বাস্তবে সমন জারি হয় তখনই, যখন তাতে যোগ হয় ‘অতিরিক্ত পয়সা’। জারিকারকেরা টাকা ছাড়া নোটিশ বা সমন নিয়ে প্রাপকের কাছে যান না। আবার অনেক সময় টাকা নিয়েও তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হাতে সেটা পৌঁছে দেন না। এ কারণে বছরের পর বছর সমন আটকে থাকে। মামলা নিষ্পত্তিতে দেরি হয়। এ ছাড়া, জারিকারকেরা অনেক সময় খরচের দু-তিন গুণ টাকাও দাবি করেন। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী বাদী-বিবাদী, আইনজীবী ও সহকারীদের মুখে মুখে।ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপই হলো সমন জারি। যদি এই ধাপেই অনিয়ম, বিলম্ব ও ভঙ্গুরতা থেকে যায়, তবে পুরো বিচারব্যবস্থা কখনোই কার্যকর হতে পারে না। সমন জারি না হলে মামলার কার্যক্রম এগোয় না; একের পর এক তারিখ পড়ে, শুনানি পিছিয়ে যায়, আর মামলার জট আরও বাড়তে থাকে। ফলাফল—বিচারপ্রার্থীর অর্থ ও সময়ের অপচয়, আর আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা কমে। এ যেন গাড়ির ইঞ্জিন ঠিক আছে, পেট্রোলও আছে, কিন্তু চাবি ঘোরানো হচ্ছে না—তাই গাড়ি স্টার্টই নিচ্ছে না।ব্রিটিশ আমলে প্রণীত সিভিল রুলস অ্যান্ড অর্ডার-এর মাধ্যমে সমনের ফি নির্ধারিত হয়েছিল। সেই সময় হয়তো দুই টাকায় একদিনের বাজার হতো, কিন্তু আজ এটি দাঁড়িয়েছে কৌতুকের পর্যায়ে। আইন যেন এক জাদুঘরে সংরক্ষিত, আর বাস্তবে চলছে একরকম ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’—কে কত দেয়, তার ওপর নির্ভর করছে সমনের গতি।ব্রিটিশ আমলের অপ্রাসঙ্গিক নিয়ম ও হাস্যকর ফি কাঠামো এখনই পরিবর্তন করা জরুরি। বিচার প্রক্রিয়াকে সচল করতে ফি কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে; যাতে জারিকারক অন্তত যাতায়াত খরচ ও মৌলিক ব্যয় মেটাতে পারেন। বর্তমান বাস্তবতা ও খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফি হালনাগাদ করা প্রয়োজন। ডাক, কুরিয়ার, ই-মেইল, মোবাইল এসএমএস বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ডিজিটাল সমন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।একবার ভাবুন তো, বিবাদীর মোবাইল ফোনে এসএমএস চলে এসেছে: ‘আপনার নামে সমন জারি হয়েছে। দয়া করে আদালতে হাজির হোন।’ অতএব, জারিকারককে আর কাগজ হাতে ঘামে ভিজতে হবে না। একই সঙ্গে ট্র্যাক করা যাবে, কে সমন পেয়েছে এবং কে ‘মোবাইল বন্ধ’ রেখেছে।আদালতে আলাদা টিম বা বিশেষ কর্মকর্তা থাকলে সমন জারির কাজ সঠিকভাবে তদারকি করা সম্ভব হবে। সমন জারিতে অনিয়ম বা বিলম্ব হলে দায়ী ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। না হলে সমন জারির ৫০ পয়সার কৌতুক ন্যায়বিচারে বিড়ম্বনার বিষয় হয়েই থাকবে।এছাড়া রায় ঘোষণার পর সেটি বাস্তবায়নের জন্য এক্সিকিউশন প্রক্রিয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় দেখা যায়, রায় ঘোষণার পরও কার্যকর হতে বছর কেটে যায়। রায় যদি সময়মতো বাস্তবায়িত না হয়, তবে ন্যায়বিচারের পূর্ণতা পাওয়া যায় না।একটি মামলার শুরু থেকে রায় বাস্তবায়ন পর্যন্ত বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ, আদালতের কর্মচারী ও প্রশাসন—সবার একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। কিন্তু সমন্বয়ের ঘাটতি পুরো প্রক্রিয়াটিকে জটিল করে তোলে। ফলে মানুষের মনে এই ধারণা জন্ম নেয়—মামলা করলেই মনে হয় জীবনের কয়েক বছর কোর্টকাছারির বারান্দায় কাটাতে হবে।বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ন্যায়বিচার শুধু রায় ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি নির্ভর করে রায় কত দ্রুত মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে তার ওপর। ৫০ পয়সার কৌতুকের বদলে সমন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও ডিজিটাল করা এবং প্রশাসনিক সমন্বয় জোরদার করলে, বিচারব্যবস্থা নিধিরাম সর্দারের চরিত্র থেকে বের হয়ে আসতে পারবে এবং সত্যিকারের সুপার হিরো হয়ে উঠতে পারবে।লেখক: আইনজীবী ও উন্নয়নকর্মী