পেঁপে পাতার চিকিৎসা: আশা, গুজব ও বাংলাদেশের ডেঙ্গু সংকট

পেঁপে পাতার চিকিৎসা: আশা, গুজব ও বাংলাদেশের ডেঙ্গু সংকট

ডেঙ্গু জ্বর এখন বিশ্বের দ্রুততম ছড়িয়ে পড়া মশাবাহিত রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বিশ্বের অর্ধেক মানুষ বর্তমানে ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় এটি এখন বার্ষিক মহামারিতে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালগুলো উপচে পড়ছে। চিকিৎসক ও চিকিৎসা সেবাদানকারীরা রয়েছেন চরম চাপে। আর পরিবারগুলো বাঁচার পথ খুঁজছে।বাংলাদেশে এ বছরের ভয়াবহ ডেঙ্গু মহামারিতে ইতোমধ্যে কয়েক শত মানুষ মারা গেছে। হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এই হতাশার সময়েই একটি কৌতূহলজনক চিকিৎসা মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে: ‘পেঁপে পাতার রস’। সাধারণ বিশ্বাস হলো—পেঁপে পাতা রক্তে প্লাটিলেট বাড়ায় এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমায়।এটি শুধু বাংলাদেশের ব্যাপার নয়। ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর সময় এ বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব ভরে গেছে নানা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্পে। পেঁপে পাতা অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে আশার প্রতীক। সস্তা, সহজলভ্য ও নিজের আঙিনায় জন্মানো এক ‘মিরাকল কিউর’।কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যিই কাজ করে?কিছু ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, পেঁপে পাতায় এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান আছে যা প্লাটিলেট উৎপাদন বাড়াতে পারে। কিন্তু এই ফলাফল এখনও প্রাথমিক। কোনও বড় আকারের, কঠোর বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে সম্পন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এখনও হয়নি।এই ঘাটতিই আসল সমস্যা। যদি পরিবারগুলো পেঁপে পাতার ওপর নির্ভর করে হাসপাতালে যেতে দেরি করে, তবে রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাছাড়া কাঁচা পেঁপে পাতার রস খেলে বমি, ডায়রিয়া, এমনকি লিভারের ক্ষতিও হতে পারে।এটি কেবল অজ্ঞতার কারণে নয়। এর পেছনে আছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা। বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলো উপচে পড়ছে। বেসরকারি চিকিৎসা ব্যয়বহুল। আর সরকারি বার্তা প্রায়ই মানুষের আতঙ্কের পেছনে পড়ে যায়। এই শূন্যতায় পেঁপে পাতা— যা সস্তা, প্রাকৃতিক ও ঘরে পাওয়া যায়— মানুষের কাছে সহজ সমাধান হিসেবে দেখা দেয়।এই চিত্র নতুন কিছু নয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও বিশ্বজুড়ে দেখা গেছে নানা ‘প্রাকৃতিক চিকিৎসা’ —আদা-রসুন, ভেষজ ওষুধ, এমনকি ক্ষতিকর উপাদানও। আফ্রিকায় হার্বাল কোভিড কিউর, লাতিন আমেরিকায় মিরাকল চা, ইউরোপ-আমেরিকায় ক্যানসার রোগীদের জন্য নানা অপ্রমাণিত ডায়েট— সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে একই প্রবণতা: যখন প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসার প্রতি আস্থা দুর্বল হয়, বিকল্প চিকিৎসা মাথা তোলে।পেঁপে পাতা বিতর্ক আমাদের দুটি জরুরি শিক্ষা দেয়।প্রথমত, গবেষণা। স্থানীয় বা প্রথাগত চিকিৎসার সম্ভাবনাময় দিকগুলো দ্রুত ও মানসম্পন্নভাবে যাচাই করতে হবে। ডেঙ্গুপ্রবণ দেশগুলোতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে বড় আকারের গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে। যদি কার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে এটি নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদভাবে চিকিৎসার অংশ হতে পারে। যদি না হয়, তবে জনগণকে স্পষ্ট তথ্য জানাতে হবে।দ্বিতীয়ত, যোগাযোগ। শুধু ‘কাজ করে না’ বলে উড়িয়ে দিলে মানুষ আস্থা হারায়। জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে মানুষের আশা স্বীকার করতে হবে, তবে বৈজ্ঞানিক সত্যটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। মূল বার্তাটি হতে হবে— পেঁপে পাতার রস এখনও প্রমাণিত চিকিৎসা নয়। জীবন বাঁচাতে একমাত্র কার্যকর উপায় হলো সময়মতো হাসপাতালে চিকিৎসা ও সঠিক মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট।বাংলাদেশের ডেঙ্গু সংকট বৈশ্বিক সতর্কবার্তা। কোনও মহামারি শুধু ওষুধ দিয়ে মোকাবিলা হয় না। এটি আস্থা, ধারণা ও তথ্যেরও লড়াই। ইন্টারনেট-সংযুক্ত দুনিয়ায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে মশার চেয়েও দ্রুত।পেঁপে পাতার গল্প মূলত কোনও গাছকে ঘিরে নয়। এটি বিজ্ঞানের সঙ্গে সমাজের দূরত্বের গল্প। এটি ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা, গণআস্থার অভাব ও ডিজিটাল গুজবের সংযোগের গল্প। সমাধান হলো সেই দূরত্ব ঘোচানো—গবেষণা, স্বচ্ছ যোগাযোগ ও শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা।যদি সেই দূরত্ব না ঘোচে, তবে পেঁপে পাতা কেবল শুরু—প্রতিটি নতুন সংকটে নতুন কোনও ‘অলৌকিক চিকিৎসা’ মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে উঠবে।লেখক: জনস্বাস্থ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ; সিনিয়র লেকচারার, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ।

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin