‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা চারবার ক্ষমতায় থেকেও পরিবারসহ অবৈধভাবে প্লট নিয়েছেন। যেটা তার দরকাই ছিল না। কারণ, তার স্বামীর নামে গণপূর্তের দেওয়া আলাদা প্লট ছিল, সেটি তিনি গোপন করেছেন। প্লট নেওয়ার জন্য যে হলফনামা দেওয়া হয়েছিল, তাতে নোটারি করা ছিল না, বিধায় সেই হলফনামা জাল নথি ছিল। শেখ হাসিনা তথ্য গোপন করে ২২ সালের আগস্টের একই মাসে ছেলে ও মেয়েসহ প্লট বরাদ্দ নেন।’
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুদকের করা পৃথক তিন মামলার রায় পর্যবেক্ষণে এমন মন্তব্য করেন ঢাকার বিশেষ জজ-৫ এর বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন।
রায় পড়ার ফাঁকে ফাঁকে এ বিশেষ জজ পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘শেখ হাসিনা একজন পলিটিক্যাল লিডার, চারবারের প্রধানমন্ত্রী। তার কত টাকা লাগবে, কত সম্পদ লাগবে! সম্পদের প্রতি এত লোভ। এটা বিশ্বে বিরল। পৃথিবীর কোথাও হয়তো এমন নেই।’
রায়ে শেখ হাসিনাকে প্লট দুর্নীতির তিন মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ২১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে একটি মামলায় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে আরেক মামলায় পাঁচ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সবাইকে অর্থদণ্ডও দেয়া হয়।
এর আগে গত রবিবার (২৩ নভেম্বর) তিন মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) রায়ের দিন ধার্য করা হয়।
আসামিদের মধ্যে একমাত্র আত্মসমর্পণকারী রাজউকের সাবেক সদস্য খুরশীদ আলম নামে এক আসামি কারাগারে রয়েছেন। অপর আসামিরা পলাতক রয়েছেন। এদিন সকালে রায়ের আগে খুরশীদ আলমকে কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। রায় ঘোষণার আগে তাকে এজলাসে তোলা হয়।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিকদেরকে প্রশংসা করে বলেন, ‘‘প্লট দুর্নীতির ব্যাপারে আপনাদের মাধ্যমেই তো দুদকের নজরে আসে। গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর একটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নিয়ে নিজ নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ২৭ নম্বর সেক্টরের কূটনৈতিক জোনের ২০৩ নম্বর রোড থেকে ১০ কাঠা করে ৬০ কাঠার ৬টি প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। এরপর দুদক টিম গঠন করে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানের রিপোর্টের ভিত্তিতে গত ১২ জানুয়ারি মামলা দায়েরের অনুমতি দেয় দুদক। এরপর অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।’’
তিনি বলেন, ‘‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিধি অনুসারে প্লট বরাদ্দ প্রার্থীর আবেদন ব্যতীত কর্তৃপক্ষ কোনও বরাদ্দ প্রদান করবে না। বিধি ৫ অনুসারে নির্দেশিত ফরম ব্যতীত আবেদন করা যাবে না। শেখ হাসিনার কোনও আবেদন না থাকা সত্ত্বেও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের নির্দেশে ১৩৪এ (২) ২ বিধি লঙ্ঘন করে ২০২২ সালের ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার অনুকূলে রাজউকের প্লট বরাদ্দের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে নোট শুরু করা হয়।’’
‘‘ওই নোটে স্বাক্ষর করেন পূরবী গোলদার, সাইফুল ইসলাম সরকার, কাজী ওয়াছি উদ্দিন, শহীদ উল্লা খন্দকার এবং শরীফ আহমেদ। পরদিন ১৯ জুলাই শেখ হাসিনার জন্য প্লট বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়ে পূরবী গোলদার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি রাজউকের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়। ২৭ জুলাই রাজউকের বোর্ড সভায় আনিছুর রহমান, শফি উল হক, খুরশীদ আলম, নাসির উদ্দীন এবং সামসুদ্দীন ওই সভায় রেজ্যুলেশন গ্রহণ করে শেখ হাসিনাকে প্লচ বরাদ্দ দেয়ার সুপারিশ করেন। প্রেসক্রাইবড ফরমে শেখ হাসিনার কোনো আবেদন না থাকা সত্ত্বেও বিধি ৫ ও বিধি ১৩৪এ (২) ২ লঙ্ঘন করে শেখ হাসিনাকে প্লট দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।’’
পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়, ‘‘২৭ জুলাই রাজউকের উপপরিচালক নায়েব আলী শরীফ স্বাক্ষরিত পত্রে শেখ হাসিনাকে পূর্বাচল নতুন শহর আবাসিক প্রকল্পে বিধি ১৩ (এ) (১) (এ) অনুসারে ১০ কাঠার প্লট পাওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন মর্মে শেখ হাসিনাকে জানানো হয়। ওই পত্রে নোটারি পাবলিক কর্তৃক প্রত্যয়ন করা হলফনামাসহ অন্যান্য কাগজপত্রে ৩১ অগাস্টের মধ্যে প্রেরণ করার অনুরোধ করা হয়। ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদিত নোটারি পাবলিক কর্তৃক প্রত্যায়িত হলফনামায় উল্লেখ করতে হবে যে, রাজউকের অদিক্ষেত্রে আবেদনকারীর নিজ নামে বা তার স্বামী, স্ত্রী,পরিবার, পোষ্যদের নামে ইতোপূর্বে রাজউক থেকে বা অন্য কোনও সরকারি বা আধা সরকারি সংস্থা থেকে ইতোপূর্বে প্লট বরাদ্দ করা হয়নি।’’
বিচারক বলেন, ‘‘শেখ হাসিনা রাজউকে হলফনামা দাখিল করেন। কিন্তু হলফনামাটি নোটারি পাবলিক বা প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বাক্ষরিত বা শপথ করা ছিল না। এতে তিনি কেবল নিজ নামে কোনও প্লট বরাদ্দ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করলেও তার স্বামী এম ওয়াজেদ আলীর নামে লিজ ডিড মূলে ১৯৭৩ সালে সরকারি জমি বরাদ্দের বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করেননি। নোটারি পাবলিক কর্তৃক প্রত্যায়িত না হওয়ায় হলফনামাটি আইনগতভাবে অকার্যকর ছিল, রাজউকের তা বিবেচনা করার কোনো সুযোগ ছিল না। তবুও অবৈধ ও অকার্যকর সেই হলফনামাকে ভিত্তি করে আসামিদের সহযোগিতায় প্লটের অস্থায়ী বরাদ্দপত্র ৩১ জুলাই জারি করা হয়।’’
‘‘অস্থায়ী বরাদ্দপত্র অনুযায়ী প্লটের মূল্য নির্ধারিত হয় কাঠা প্রতি তিন লাখ টাকা। ১০ কাঠা জমির মূল্য ৩০ লাখ টাকা। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রথম কিস্তি ১২ লাখ টাকা জমা দিতে বলা হয়। শেখ হাসিনা কর্তৃক ৩ অগাস্ট সোনালী ব্যাংকের গণভবন শাখা থেকে রাজউকের অনুকূলে ১২ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দেয়া হয়। ওইদিনই রাজউকের ২৭ নং সেক্টরের কূটনৈতিক জোনের ২০৩ নং বোডের ৯ নং প্লট শেখ হাসিনার অনুকূলে চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র জারি করা হয়। প্লটের নির্ধারিত মূল্য পরিশোধের পর প্লট হস্তান্তরের জন্য সুপারিশ করা হলে শেখ হাসিনা নিজ স্বাক্ষরে ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্লট হস্তান্তরের আবেদন করেন— যা এই মামলার অপরাধমূলক মনোভাব (মিনস রিয়া) হিসেবে গণ্য হয় বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন বিচারক।’’
তিনি বলেন, ‘‘শেখ হাসিনা নিজ স্বাক্ষরে ১২ সেপ্টেম্বর লিজ দলিল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন এবং ৩০০ টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে আরেকটি শপথ না করা হলফনামা দেন, যেখানে নিজ নামে কোনও প্লট না থাকার কথা উল্লেখ থাকলেও স্বামী বা পরিবারের নামে বরাদ্দকৃত জমির তথ্য গোপন রাখা হয়। এ হলফনামাটিও আইনগতভাবে অকার্যকর ছিল। তথাপি রাজউক লিজ দলিল সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নেয়। ওইদিন রাজউক এবং শেখ হাসিনার মধ্যে প্লটের চুক্তি কালীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত হয়।’’
বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘‘ফাইনালি প্লট বুঝিয়ে দিতে দরখাস্ত দিলেন শেখ হাসিনা। সম্পদের প্রতি তার লোভ আছে। না হলে আবেদনটি ছুঁড়ে ফেলতে পারতেন। বলতেন, প্লট দরকার নাই। তা না করে বুঝে নিতে আবেদন করেন। পরে ৯ প্লটটি চূড়ান্তভাবে তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। এখানে রাজউক এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অন্যায় করেছে। শেখ হাসিনা অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত, প্রতারণা করেছেন। তিনি এটা না পেলে অন্য কোনও একজন যার প্রয়োজন এমন কেউ হয়তো পেতেন।’’
বিচারক পর্যবেক্ষণে আরও বলেন,নিজে ছেলে-মেয়ের পর তিনি বোন, বোনের ছেলে-মেয়ের জন্য প্লটের জন্য সুপারিশ করলেন। গোষ্ঠী, এরিয়া, জেলা সবার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। মামলার বিষয়বস্তু না হওয়ায় এগুলো আর বললাম না।’’
পরে আদালত পর্যায়ক্রমে তিন মামলার রায় দেন বিচারক। রায় পর্যবেক্ষণ শেষে বিচারক এজলাস থেকে নেমে যান।