আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস পালন হলো গতকাল। প্রতি বছর আমাদের মনে করিয়ে দেয় গণতন্ত্রে তথ্য কেবল একটি উপাদান নয়, এটি হচ্ছে গণতন্ত্রের অপরিহার্য অঙ্গ। বাংলাদেশ ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করে সেই পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই আইনের কার্যকর প্রয়োগ এখনও আশাব্যঞ্জক নয়। এদিকে বিগত সরকারের সময়ে গঠিত তথ্য কমিশন গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে পদত্যাগ করায় কমিশন কার্যত অকার্যকর হয়ে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাস অতিবাহিত হলেও তথ্য কমিশন পুনর্গঠন না হওয়ায় নাগরিকদের তথ্য অধিকার অনেকটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
মূলত তথ্য অধিকার আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করে কমিশনের ওপর। কমিশন ছাড়া নাগরিকরা কোথায় গিয়ে অভিযোগ জানাবেন, কাকে দিয়ে প্রশাসনকে জবাবদিহি করাবেন? আজ যখন কমিশন শূন্য, তখন রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির যে আকাঙ্ক্ষা তা অনেকটা বাধার মুখে পড়ছে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকরা সরাসরি তথ্য পাচ্ছেন না, নাগরিকরা ভূমি অফিস থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত নানা জায়গায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আমরা দ্রুত এই পরিস্থিতির উত্তরণ দেখতে চাই।
আমাদের দেশে সরকারি দফতরগুলোর দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি-তথ্য না দেওয়ার প্রবণতা। বাংলাদেশে এখনও অনেক সরকারি দফতর অধিদফতরের কর্মকর্তা মনে করেন, তথ্য প্রকাশ করা মানেই তাদের ক্ষমতা কমে যাওয়া। তাই নানা অজুহাতে তথ্য আটকে রাখা হয় আবার কখনও বলা হয় তথ্য দেওয়া যাবে না। এ প্রবণতা যেন আমাদের সংস্কৃতি হয়ে রয়েছে। সত্যি কথা হলো, সরকারি সংস্কৃতির এই জড়তা ভাঙা ছাড়া কোনও কমিশনই কার্যকর হতে পারবে না।
তথ্য পাওয়ার অধিকার বাস্তবায়নে সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত বড়। নাগরিকদের অধিকার রক্ষার জন্য কমিশন গঠন করার পাশাপাশি প্রশাসনের অভ্যন্তরে তথ্য উন্মুক্ততার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে তথ্য গোপন কোনও বিকল্প নয়, বরং তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক। প্রশিক্ষণ, তদারকি, এমনকি শাস্তি সবই থাকতে হবে, যাতে তথ্য আটকে রাখার প্রবণতা ভাঙা যায়।
উপমহাদেশের অন্য দেশগুলো আমাদের সামনে কার্যকর উদাহরণ হাজির করেছে। ভারত ২০০৫ সালে তথ্য অধিকার আইন চালুর পর সেখানে প্রথম দিকে আমলাতান্ত্রিক বাধা ছিল। কিন্তু শক্তিশালী তথ্য কমিশন ধারাবাহিক কাজ করে দফতরগুলোকে বাধ্য করেছে তথ্য প্রকাশে। নেপালে ২০০৭ সালের পর একইভাবে কমিশনের সক্রিয় ভূমিকায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে তথ্য উন্মুক্ত করার অভ্যাস গড়ে তুলেছে। আর শ্রীলঙ্কা, যেখানে ২০১৬ সালে আইন কার্যকর হয়েছে, সেখানেও কমিশন সাংবাদিকদের সহায়তা করছে সরকারি গোপনীয়তা ভাঙতে। এসব দেশ দেখিয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি কমিশনের সক্রিয় অবস্থানই পারে তথ্য গোপনের সংস্কৃতি ভাঙতে।
বাংলাদেশও যদি সত্যিকারের গণতন্ত্র চায়, তবে এখনই কমিশন গঠন করে তাকে স্বাধীনতা ও শক্তি দিতে হবে। কমিশনে নিয়োগ হতে হবে সৎ, নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের। কমিশনের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে সরকারি দফতরগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে- তথ্য দেওয়া কোনও উপকার নয়, এটি জনগণের অধিকার।
আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসে আমাদের উপলব্ধি হওয়া উচিত, তথ্য গোপন মানেই নাগরিকের চোখ বেঁধে রাখা। আর তথ্য উন্মুক্ত মানেই নাগরিককে রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। কমিশন পুনর্গঠন, তথ্য দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং সরকারি দফতরগুলোর জড়তা ভাঙাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। অন্যথায় তথ্য অধিকার দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, বাস্তব পরিবর্তন আসবে না।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী