যে অভিনেতা ‘মরদেহ’ চরিত্রেও জীবন্ত!

যে অভিনেতা ‘মরদেহ’ চরিত্রেও জীবন্ত!

ভারতের অন্যতম সেরা কৌতুক অভিনেতা সতীশ শাহ আর নেই। ৭৪ বছর বয়সে কিডনি বিকল হয়ে শনিবার (২৫ অক্টোবর ২০২৫) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু হাস্যরসের জগতে তিনি রেখে গেলেন এক অনন্য উত্তরাধিকার—যেখানে এমনকি সবচেয়ে তুচ্ছ চরিত্রও তার হাতে পেত গভীরতা, উষ্ণতা এবং মানবিক ঔজ্জ্বল্য।

যদি কখনও কোনও ‘মরদেহ’ সিনেমাকে জীবন্ত করে তুলতে পারে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে কমিশনার ডি’মেলো চরিত্রটি!

কুন্দন শাহ পরিচালিত ১৯৮৩ সালের কালজয়ী ব্যঙ্গচিত্র ‘জানে ভি দো ইয়ারো’-এর অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রের মধ্যে ডি’মেলো আলাদা স্থান দখল করে আছে। ঘুষখোর, সদ্য মৃত এই সরকারি কর্মকর্তা—যার দেহ পরবর্তী দুই ঘণ্টা ধরে মুম্বাইয়ের পথে পথে টানা হয়—ছিল এক অবিস্মরণীয় প্রতীক।

সতীশ শাহ এই চরিত্রের মাধ্যমে ‘জিন্দা লাশ’ কথাটিরই নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন।

সতীশ শাহ ছিলেন শুধু একজন কৌতুক অভিনেতা নন; তিনি ছিলেন এক হাস্যরস-দার্শনিক, যিনি হাসির আড়ালেও দেখাতে পারতেন মানুষ ও মানবতার রূপ।

প্রায় ৫০ বছরের ক্যারিয়ারের অসংখ্য চরিত্রের মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় অবশ্যই ছিল টেলিভিশনের কিংবদন্তি শো ‘সারাভাই ভার্সেস সারাভাই’-এর ইন্দ্রবদন ‘ইন্দু’ সারাভাই। পরিবারের সুখ-দুঃখের নাটুকে প্রধান হিসেবে তার সেই উষ্ণ রসবোধ ও বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে। রত্না পাঠক শাহের সঙ্গে তার যুগলবন্দি ছিল নিখুঁত।

ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শাহ ছিলেন পর্দার এক চিরচঞ্চল উপস্থিতি। তার ব্যাচমেট কুন্দন শাহ দ্রুত চিনে ফেলেছিলেন এই ‘কুইকসিলভার’ প্রতিভাকে। আর ‘ইয়ে যা হ্যায় জিন্দেগি’ (১৯৮৪)-তে তার উপস্থাপনা ছিল এক হাসির বিস্ময়।শাফি ইনামদার ও স্বরূপ সম্পতের সঙ্গে এই ধারাবাহিকে ৬০ পর্বের মধ্যে ৫৫টি ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সতীশ শাহ—কণ্ঠ, ভঙ্গি, মুখভঙ্গি, সবকিছু বদলে।

সতীশ শাহদের মতো সহজ অভিনেতারা আসলে ভীষণ পরিশ্রমী। তাদের অভিনয় এত মসৃণ যে, আমরা ভুলে যাই হাস্যরস তৈরি করতেও কত গভীর শ্রম ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। বিশেষত হিন্দি সিনেমায়, যেখানে হাস্যরস মানেই অনেক সময় অশালীনতা বা উচ্চকণ্ঠের ফাজলামি, সেখানে শাহ ছিলেন সূক্ষ্মতা ও রুচির প্রতীক।

তিনি কখনও স্রেফ কৌতুক অভিনেতা ছিলেন না—বরং এমন চরিত্রশিল্পী, যিনি হাস্যরসকে চরিত্রের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন।তা সে ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ (১৯৯৪)-এর ‘ডক্টর চাচা’-ই হোক—যিনি সালমান খান ও মাধুরী দীক্ষিতের প্রেমে কবিতা আওড়ান—অথবা ‘আকেলে হম আকেলে তুম’ (১৯৯৫)-এ আমির খানের সংগ্রামী সংগীতশিল্পীকে সুযোগ দেওয়া এক সংগীত ব্যবসায়ী,বা ‘ম্যায় হুঁ না’ (২০০৪)-এর সেই হাস্যকর অধ্যাপক, যাকে শাহরুখ খান বারবার এড়িয়ে চলেন—প্রতিটি ভূমিকায় তিনি এনে দিতেন মানবিক উষ্ণতা।

তিন খান (আমির, সালমান, শাহরুখ)-এর সঙ্গে অসংখ্য সহ-চরিত্রে তিনি যেমন দীপ্তি ছড়িয়েছেন, তেমনি ৭০–৮০-এর দশকের সাঈদ আখতার মির্জা পরিচালিত সমাজ-সচেতনতার চলচ্চিত্রগুলোতেও রেখেছেন গভীর ছাপ।

অরবিন্দ দেশাইয়ের ‘আজীব দাস্তান’ (১৯৭৮) ও অ্যালবার্ট পিন্টোর ‘গুস্সা কিউঁ আতা হ্যায়’ (১৯৮০)-এ তার চরিত্রগুলো ছিল ওজনদার, চিন্তাশীল এবং সমাজ-নির্ভর।

৮০ ও ৯০-এর দশকে টেলিভিশন ও সিনেমার যে বিনোদন-পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছিল, তার প্রায় প্রতিটি ঘরানায় কোথাও না কোথাও ছিলেন সতীশ শাহ—গোলগাল মুখে দীপ্ত চোখ, হাসি-রাগ-খুশির দ্রুত পরিবর্তন, আর সেই অমর গোঁফের দুলুনি যেন তার সিগনেচার হয়ে উঠেছিল।

একটি সিনেমার দৃশ্য মনে পড়ে—সেখানে তিনি এক সেক্সোলজিস্ট, রঙিন শার্ট পরে, লিফটে দু’জন তরুণীর মাঝে দাঁড়িয়ে রিতেশ দেশমুখ-কে পরামর্শ দিচ্ছেন। অন্য কোনও অভিনেতা হলে দৃশ্যটি হয়তো অশালীন হয়ে যেত, কিন্তু শাহ তার নিজের সহজ রুচি ও পুরনো দিনের সৌজন্য দিয়ে সেটিকে করে তুলেছিলেন রসিক অথচ স্নিগ্ধ।

এই কারণেই পারিবারিক বা হালকা কৌতুকমুখী ভূমিকায় তিনি সবসময় ছিলেন বেশি স্বচ্ছন্দ।

শেষবার যখন দেখি ‘জানে ভি দো ইয়ারো’-এর সেই অমর দৃশ্য— নাসিরউদ্দিন শাহ ও রবি বসওয়ানির সঙ্গে, হাসি ও প্রতারণার মিশেলে তৈরি এক অদ্ভুত রসায়ন, যেখানে ডি’মেলো-র মুখে স্থির হয়ে থাকে এক চিরন্তন হাসি।

সেই চলচ্চিত্রে এবং পরবর্তী অগণিত ছবিতে, সতীশ শাহ ছিলেন শুধু এক কৌতুক অভিনেতা নন— তিনি ছিলেন এক মানবিক শিল্পী, এক হাস্যরসিক মানবতাবাদী, যার তুলনা সত্যিই নেই।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Comments

0 total

Be the first to comment.

এক টিকিটে তিন নাটক! BanglaTribune | বিনোদন

এক টিকিটে তিন নাটক!

নাট্যপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য সন্ধ্যা অপেক্ষা করছে! চারুনীড়ম থিয়েটার উদযাপন করতে যাচ্ছে তাদের ১০০তম ম...

Sep 13, 2025

More from this User

View all posts by admin